প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে উচ্ছেদের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশে চলমান ধরপাকড়ের মধ্যে মুবীন কৌশলে দেশ ছাড়েন। আর পেছন থেকে তাকে সহায়তা করেছে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ইউনাইটেড গ্রুপের কর্তাব্যাক্তিরা।
রবিবার দিবাগত রাতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালক লে. কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছের গ্রেপ্তারের পর মুবীনের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
পরবর্তীতে ঢাকাটাইমস একাধিক সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীন বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন।
সূত্র জানিয়েছে, মুবীন ইউনাইটেড গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা (সাবেক চেয়ারম্যান) হাসান মাহমুদ রাজার সম্পর্কে বিয়াই। অবসরের পর তিনি ইউনাইটেড গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাওয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মুবীনের এই বিদেশে অবস্থান ঘিরে আবারও সামনে এসেছে ২০১০ সালের সেই বহুল আলোচিত উচ্ছেদ ঘটনা।
বিশ্বস্ত সূত্রে ঢাকাটাইমস জানতে পেরেছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক জ্বালানি ও শিল্প খাতে ইউনাইটেড গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিস্তৃত। এর মধ্যে ইউনাইটেড পাওয়ার অ্যান্ড রিসোর্সেস (ইউপিআর) দেশটির জুরং এলাকায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। একইসঙ্গে ইউনাইটেড এনার্জি ট্রেডিং পিটিই লিমিটেড (ইউইটিপিএল) সিঙ্গাপুরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে।
দেশে ধরপাকড় শুরু হলে কৌশলে সিঙ্গাপুর চলে যান আব্দুল মুবীন। সেখানে অবস্থান করতে তাঁর ওয়ার্ক পার্মিটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়; যা ইউনাইটেড গ্রুপই তাঁকে সরবরাহ করে। বর্তমানে মুবীনকে ইউনাইটেড গ্রুপের সিঙ্গাপুর এনার্জি ট্রেডিংয়ের কর্মকর্তা সাজিয়ে দেশটিতে অবস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
এদিকে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করা হয়। সে সময় সেনাপ্রধান ছিলেন মুবীন। বিএনপি ও দলটির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছিল এবং তাতে তৎকালীন সেনাপ্রধানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্ছেদের দিন সেনাসদস্যদের উপস্থিতিতে খালেদা জিয়াকে বাসভবন ছাড়তে বলা হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, বিচারাধীন বিষয় নিষ্পত্তির আগেই তাকে ‘এক কাপড়ে’ বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
বিএনপির নেতাদের দাবি, ঘটনাটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলেও তা কার্যকর করতে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের সম্মতি ছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় সেনাপ্রধান হিসেবে মুবীন সরকারকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, এ ঘটনায় বাহিনীর ভেতরে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে না।
অবসরের পর মুবীন ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। জ্বালানি খাতের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইউনাইটেড পাওয়ারের পক্ষ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা এবং চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে; যা সরাসরি করতে মুবীন।
এদিকে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে একাধিকবার তাঁর ব্যাক্তিগত মোবাইলে ফোন এবং খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাতে তিনি সাঁড়া দেননি।
ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে সাবেক সেনা কর্মকর্তা (বরখাস্ত লে. কর্নেল) আফজাল নাছেরের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে ইউনাইটেড গ্রুপে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। প্রথমে জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন) হিসেবে যোগ দিয়ে পরে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী পরিচালক হন তিনি।
আরও জানা যায়, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীনের সুপারিশে ইউনাইটেড গ্রুপের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আফজালের চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নির্যাতনের সঙ্গে এই দুই সেনা কর্মকর্তা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
আরও পড়ুন:








