গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অবৈধ ব্যবসায় সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট ও চক্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে এসব চক্র জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল করছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। এই সুযোগে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরিতে দুটি প্রধান সিন্ডিকেট কাজ করছে। প্রথমটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক। এই সিন্ডিকেট বিদেশি জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল নামিয়ে আনে। দ্বিতীয়টি ঢাকার সরবরাহ ও বিতরণ কেন্দ্রিক, যা খুচরা বাজার ও ডিলার পর্যায়ে কারসাজি করে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেট্রোল পাম্প মালিকদের একটি বড় অংশ বিগত আওয়ামী সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী। তারা কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরি করে পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে। এ বিষয়ে নিয়মিত গোয়েন্দা প্রতিবেদন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে পাঠানো হচ্ছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে ট্যাংক লরিগুলো থেকে তেল চুরি করা হয়। অনেক সময় ডিপোতে তেল লোড করার সময় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিটি লরিতে ১৫০ থেকে ২০০ লিটার বাড়তি তেল দেওয়া হয়, যা পরে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া পাম্প মালিকরা দাম বাড়ার অপেক্ষায় তেল মজুত করে রাখেন এবং হঠাৎ করে সরবরাহ নেই বলে সংকট তৈরি করেন।
সম্প্রতি অভিযানে এসব কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে মজুত প্রায় ৬ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন। ওই দিন জামালপুরে ১৫টি ড্রামে ৩ হাজার লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়। ২৬ মার্চ শেরপুর শহরের একটি আবাসিক ভবনের নিচতলায় ২৫ হাজার লিটার তেলের ট্যাংক পাওয়া যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতেও পাম্পে বিপুল তেল মজুত রাখার পর বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণ মিলেছে।
চোরাই তেলের মূল কারবার নদী ও সাগরে হয়। কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত বড় জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল নামিয়ে উপকূলে ড্রাম ও ট্যাংকে লুকিয়ে বিক্রি করা হয়। সরকারি আমদানি করা তেল চুরিতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে সিস্টেম লস নামক ঢাল, যা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া জাহাজভাঙা শিল্প থেকেও অব্যবহৃত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল জানিয়েছেন, জাতীয় সংকটের সময় যারা এ ধরনের কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি মনে করেন, এখানে প্রত্যক্ষ নাশকতা রয়েছে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের কার্যালয় জানিয়েছে, কারসাজি ঠেকাতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক ড. শামসুল আলম মনে করেন, জাহাজ থেকে ডিপো, ডিপো থেকে পাম্প ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তিনি লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং সতর্ক করেন যে কিছু সরকারি কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কঠোর পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানিয়েছেন, অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে তেল সংগ্রহ, মজুত ও বিক্রির কারণে বড় অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি খাত শতভাগ অটোমেশনের আওতায় না আসা পর্যন্ত কারচুপি অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিপিসির সব কার্যক্রম শতভাগ অটোমেশনে আসেনি।
আরও পড়ুন:








