রবিবার

২৯ মার্চ, ২০২৬ ১৫ চৈত্র, ১৪৩২

ঋণখেলাপি হয়েও সংসদে: স্থগিতাদেশের আড়ালে ৯ জন এমপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ মার্চ, ২০২৬ ১০:৪৫

শেয়ার

ঋণখেলাপি হয়েও সংসদে: স্থগিতাদেশের আড়ালে ৯ জন এমপি
ছবি সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপি থাকা সত্ত্বেও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অন্তত ৩০ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে নয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং তাঁরা ইতিমধ্যে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। নির্বাচনে জয়ী অন্য দুই প্রার্থীর ফলাফল আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো থেকে প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী, ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ৮২ জনের মধ্যে ৩১ জনকে আদালতের স্থগিতাদেশের ভিত্তিতে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ১২ ধারায় ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, নির্বাচনের পূর্বে সম্ভাব্য প্রার্থীরা আংশিক টাকা পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিল করিয়ে অথবা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এই বাধা অতিক্রম করেন। একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কারও পদ বাতিল হয়েছে—এমন নজির পাওয়া যায় না। নির্বাচনে জয়লাভের পর অনেক সংসদ সদস্য ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ পুনর্বিন্যাস করে নেন।

সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নাম আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া ৩১ জনের তালিকায় ছিল। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকে শত কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যা ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তিনি জানান, নির্বাচনের আগেই তাঁর ঋণ নিয়মিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিজয়ী গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নামে ৬৭৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। তিনি জানান, নির্বাচনের আগেই ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল এবং ঝুঁকিমুক্ত থাকতে তিনি স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলামের অন্তত ৭৬৫ কোটি টাকার ঋণখেলাপি সংক্রান্ত স্থগিতাদেশ ছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নিজের নামে, জামিনদার ও পরিচালক হিসেবে পাঁচ ব্যাংকে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর ফলাফল স্থগিত রয়েছে। তিনি বলেন, ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ করেছেন এবং আদালত থেকে নতুন করে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। চট্টগ্রাম-২ আসনের বিজয়ী সারোয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন কোম্পানির নামে ২০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। তাঁর ফলাফলও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত আছে।

কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর চূড়ান্ত বিচারে ঋণখেলাপি হওয়ায় প্রার্থিতা বাতিল হয়। তবে স্থগিতাদেশ পাওয়া বাকি ৩০ জনের মধ্যে কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া মনোনয়ন বাতিলের পর হাইকোর্টের রিটের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পান। বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। তাঁর আইনজীবী জানান, সিআইবি হালনাগাদে সময় লাগায় ঝুঁকি এড়াতে স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া কুমিল্লা-৯ আসনের আবুল কালাম, টাঙ্গাইল-৪ আসনের লুৎফর রহমান ও মৌলভীবাজার-৪ আসনের মুজিবুর রহমান চৌধুরীসহ আরও তিন বিএনপি সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত মামলায় আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিতাদেশ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ঋণখেলাপি যাঁদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাঁদের অনুমতি দিয়েছে বলে এটা করতে হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিআইবিতে ঋণখেলাপি দেখানো যাবে না—এমন আদেশ আদালত দিতেই পারেন। তবে সময়টা সীমাহীন না হওয়াই ভালো। তিনি মনে করেন, ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে তা ফেরত দিতে না পারা ব্যক্তিরা যত কম সংসদ সদস্য হতে পারেন, তা দেশের অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর।

অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম বলেন, ঋণখেলাপিদের সংসদে আসার সুযোগ করে দেওয়াটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বরের হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।



banner close
banner close