রবিবার

২৯ মার্চ, ২০২৬ ১৫ চৈত্র, ১৪৩২

সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি: ব্যবস্থাপনা ঘাটতিতে বাড়ছে প্রাণহানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ মার্চ, ২০২৬ ০৮:১৩

শেয়ার

সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি: ব্যবস্থাপনা ঘাটতিতে বাড়ছে প্রাণহানি
ছবি সংগৃহীত

দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল তদারকির কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং সাম্প্রতিক ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দুর্ঘটনার সংখ্যা পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট করেছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে ও পরে ১০ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। গত বছরের একই সময়ে ১১ দিনে ২৪৯ জন নিহত হওয়ার তুলনায় এবার মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেছে। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুসহ পাঁচজন নিহত হন। ঘটনাস্থলে একটি বাস বিকল অবস্থায় থাকায় যাত্রীরা রেললাইনের ওপর অবস্থান করছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানান, রেলপথে চলাচল আইনত নিষিদ্ধ এবং যাত্রীদের অনিয়মিত অবস্থানের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।

এর আগে কুমিল্লায় বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের অনুপস্থিতি ছিল বলে জানা যায়। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ঘাট ব্যবস্থাপনার ত্রুটি সামনে আসে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ জানান, ফেরি প্রস্তুত হওয়ার আগে চালকের ভুলে বাসটি পন্টুনে ওঠে এবং নিয়ম না মেনে অগ্রসর হওয়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে পন্টুনে রেলিং স্থাপন ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ অতিরিক্ত গতি, অতিরিক্ত বোঝা বহন এবং মানবিক ভুল। পাশাপাশি অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পুলিশের গবেষণা অনুযায়ী, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪২ শতাংশের জন্য দায়ী।

রেলপথে গেটম্যানের ঘাটতি, অরক্ষিত লেভেলক্রসিং এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। দেশে প্রায় ৮২ শতাংশ রেলপথ অরক্ষিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একইভাবে নৌপথে অরক্ষিত পন্টুন, রেলিংয়ের অভাব, ঘাটে বিশৃঙ্খল যান চলাচল এবং ফিটনেসবিহীন নৌযান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান তথ্য দেন, ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং সক্ষমতার ঘাটতির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। ঈদকেন্দ্রিক সময়ে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরিবহন খাতে সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন জরুরি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান তথ্য দেন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কার্যকর তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন সীমিত। কার্যকর সমন্বয়, কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।



banner close
banner close