মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি পণ্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি দপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাধিক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং করপোরেশনসহ সব দপ্তরে দায়িত্বশীলভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার না করা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখা, অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমানো এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনের ব্যবহার সীমিত করা এবং জ্বালানি খরচ হয় এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের আটটি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইউরিয়া উৎপাদনকারী চারটি কারখানার পাশাপাশি কাফকো বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড এবং ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড চালু রয়েছে। বিসিআইসির উৎপাদন ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক ও যুগ্ম সচিব মো. মনিরুজ্জামান জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সাময়িকভাবে ইউরিয়া সার কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫ দিনের জন্য এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছে। ৪ মার্চ প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব দেশের জ্বালানি খাতেও পড়তে পারে। সম্ভাব্য দুর্ভোগ এড়াতে সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই বিজ্ঞপ্তিতে খোলাবাজারে ডিজেল ও পেট্রল বিক্রি বন্ধ রাখতে ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি পাচার রোধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৪ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় বিকল্প উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালাতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যেখানে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস আসে এলএনজি থেকে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি আমদানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বড় এলএনজি সরবরাহকারী দেশগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রমে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বেড়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে জ্বালানি সংগ্রহে মানুষের ভিড় দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অনেক পাম্পে দ্রুত মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নীলক্ষেতের কিউজিএস সামদানি পেট্রল পাম্পের ম্যানেজার বিশ্বপল জানান, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে দুই দিনের মজুদ একদিনেই শেষ হয়ে গেছে এবং নতুন চালান না আসা পর্যন্ত সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বর্তমানে এ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন:








