বৃহস্পতিবার

৫ মার্চ, ২০২৬ ২১ ফাল্গুন, ১৪৩২

এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সব নির্বাচন করতে চায় সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ মার্চ, ২০২৬ ০৯:০৯

শেয়ার

এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সব নির্বাচন করতে চায় সরকার
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সম্প্রতি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট এবং খুলনা সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয় নতুন সরকার। আর এতে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি স্থানীয় সরকার নির্বাচন সহসাই হচ্ছে না। যদিও এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সরকার আগামী এক বছরের মধ্যে সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্নের পরিকল্পনা করছে। আর সরকার চাইলে এই সময়ের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) তা সম্পন্নও করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, সে বিষয়টি সংসদ থেকে চূড়ান্ত হতে হবে। তার পরই শুরু হবে নির্বাচনের প্রক্রিয়া।

গত মঙ্গলবার একই ধরনের কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, সংসদে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীকের বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচন হবে না। আইন আকারে পাস হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে আইন সংশোধন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীকের বিধান বাতিল করে। আগামী ১২ মার্চ অন্য আরও অনেকগুলোর সঙ্গে এই অধ্যাদেশটিও সংসদে উপস্থাপন করা হবে। কোন কোন অধ্যাদেশ গৃহীত হবে, তা সংসদই নির্ধারণ করবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয় প্রতীকে হবে, এর জন্য আমরা সংসদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। সংসদ সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেগুলো করতে হবে। আশা করছি, রমজানের পর সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম শুরু করতে পারব।’ এ ছাড়া অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সারা বছর নির্বাচন কমিশন ব্যস্ত থাকবে বলেও জানান তিনি।

ইসির সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার থাকতেই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত ১ ফেব্রুয়ারি কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। তা কমিশনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এই তিন সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্যও সব নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ করে রেখেছে কমিশন। শুধু ইউনিয়ন পরিষদের জন্য কেনাকাটা করতে হবে। সরকার চাইলে দ্রুততম সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্যও সব সামগ্রী সংগ্রহ করা যাবে। যেহেতু সব নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। তাই কমিশনের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি হবে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর এবং পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন। পরে জনপ্রতিনিধিরা আত্মগোপনে কিংবা পরিষদে না যাওয়ায় নাগরিক সেবা ব্যাহতের কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। এর মধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ করে। যদিও পরে আদালতে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হন দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন। পরবর্তী সময়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট ও খুলনায় নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।

ইউনিয়ন পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচনের প্রথম ধাপে ২০২১ সালের ২১ জুন ভোটগ্রহণ হয়। পঞ্চম ধাপে নির্বাচন হয় ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি। প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হওয়া ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষণগণনা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

সূত্র আরও জানায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সব জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাতে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে কারা দায়িত্ব পালন করছেন, তা একটি ছকে তৈরি করে পাঠাতে বলা হয়েছে। কতটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন, কতটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন, কতটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন—সে তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে ওই চিঠিতে।

অন্যদিকে, ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ২৫টি পৌরসভায় ভোট হয়। পরে কয়েক ধাপে বাকিগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসাবে পৌরসভার পাঁচ বছর মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আর ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর দেশে জেলা পরিষদ নির্বাচন হয়েছে। সেদিন ৬৪টি জেলার মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলায় নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয় ৫৭ জেলায়।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, এক সময় সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতো। পরে বিনা ভোটখ্যাত (দশম সংসদে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী) নির্বাচন করা কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন কমিশনের আমলে আইন ও বিধি সংশোধন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করা হয়। সে সময় বিভিন্ন মহল থেকে এর সমালোচনাও করা হয়। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি সে সময়ের ক্ষমতাসীন দল ও ইসি। পরে দলীয় কোন্দল ও প্রার্থী কম হওয়ার শঙ্কায় ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পদত্যাগ করা কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান বাতিলের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে প্রথমে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বহাল রেখে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ২৫০ জন ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর দেওয়ার বিষয়টি বাদ দেয়। এর ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৮ মে প্রথম ধাপে উপজেলা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। চার ধাপের এ নির্বাচন সে বছরের ৫ জুন শেষ হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ) দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল করে। এখন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস হবে কি না এবং তাতে দলীয় প্রতীক ও পরিচয় থাকছে, নাকি বাতিল হচ্ছে—স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন তার অপেক্ষায় রয়েছে।



banner close
banner close