ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার খাসমহল এলাকার এই জীর্ণ ঘরেই বেড়ে উঠেছেন শহীদ ওসমান হাদি। ১৯৯৩ সালে এখানেই তাঁর জন্ম। কে জানত, এই ঘর থেকেই জন্ম নেবে বাংলা ইতিহাসের এক নতুন স্বপ্নদ্রষ্টা।
নলছিটির এই অজপাড়াগাঁয়ে হাসি-খেলায় বেড়ে ওঠেন হাদি। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় শিক্ষক বাবার কাছেও ছিলেন অত্যন্ত আদরের সন্তান।
নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন হাদির বাবা শরীফ মাওলানা আব্দুল হাদি। এলাকাবাসীর কাছে তিনি একজন প্রতিবাদী মানুষ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাই ছোট থেকেই আদর্শ বাবার আদর্শ সন্তান হয়ে ওঠার প্রত্যয় ছিল হাদির মাঝে।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সেখানে বেশি দিন পড়া হয়নি। তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর বাবা তাঁকে নিজের মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একে একে ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, আলিম সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে বাবার পথেই হাঁটেন হাদি। পেশা হিসেবে বেছে নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। তবে এর পাশাপাশি তিনি গণমানুষের ইনসাফের সংগ্রাম চালিয়ে যান। জুলাই আন্দোলনে দৃপ্ত নেতৃত্ব দেওয়ার পর গড়ে তোলেন ইনকিলাব মঞ্চ এবং শুরু করেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক নতুন লড়াই।
এই পথচলা একদিনে শুরু হয়নি। ছোট থেকেই বাবার মতো প্রতিবাদী ছিলেন হাদি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই যুক্ত ছিলেন ছোট ছোট ইসলামী অনুষ্ঠানের সঙ্গে। বন্ধুদের দিতেন নানা দিকনির্দেশনা।
সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন মাদ্রাসার বিভিন্ন ক্যাম্পেইন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সক্রিয় ছিলেন স্বাধীনচেতা হাদি। মানুষকে দেশপ্রেম ও ভালো নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দিতেন। সুযোগ পেলেই এলাকার শিশু থেকে যুবক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যুক্ত হতেন নানা সামাজিক কাজে। কখনো কারও বিরাগভাজন হননি তিনি।
ছোট থেকেই হাদি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। সবসময় সত্য ও ইনসাফের কথা বলতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেশি দিন পড়ার সুযোগ না পেলেও মাদ্রাসা জীবনেই তাঁর প্রকৃত বিকাশ ঘটে। তবে সুযোগ পেলেই তিনি এই শিক্ষকের কাছে ছুটে আসতেন, যার কাছ থেকে মানবিক শিক্ষার দীক্ষা নিয়েছেন।
শুধু পরিবার নয়, আত্মীয়স্বজনদের কাছেও ছিলেন প্রিয় মুখ।
এলাকাবাসী, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের মুখে একই কথা—হাদি ছিলেন দৃপ্ত সংগ্রামের প্রতীক।
হাদির মতো প্রতিবাদী মানুষ এই সমাজে বিরল। এত মানুষের অশ্রুজলে সিক্ত হবেন হাদি—এটি হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি। তাঁর এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছে না এলাকাবাসী। তারা মনে করেন, হাদির প্রতিটি রক্তবিন্দু একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
ওসমান হাদির স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই। ছাত্রজীবনে তিনি একটি বইও লিখেছিলেন। এমন প্রতিবাদী ও বিপ্লবী মানুষ সমাজে আবার পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
নলছিটি থানার ওসি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কমবেশি অভিযোগ থাকেই; কিন্তু হাদির বিরুদ্ধে অভিযোগ তো দূরের কথা, এই থানায় তাঁর নামে কোনো জিডিও নেই।
ব্যক্তিজীবনে হাদি এক সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রীও উচ্চশিক্ষিত। বড় ভাই ডা. মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক বরিশালের বাগিয়া আল-আমিন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। ছোট বোন বাবার মাদ্রাসায় বিজ্ঞানের শিক্ষক। অন্য ভাই-বোনরাও শিক্ষাজীবন শেষ করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
আরও পড়ুন:








