মাত্র ২৩ বছর বয়স। ঘরে রেখে গেছেন ছয় মাসের শিশু সন্তান, বুকভরা স্বপ্ন আর রাজপথের শপথ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কারফিউ ভেঙে ঢাকার আশুলিয়ায় ফ্যাসিস্ট শাসন অবসানের আন্দোলনে যোগ দিয়ে পথে নেমেছিলেন বায়েজিদ বোস্তামি। সেদিনই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি। শুধু গুলি নয়— রক্ত-পিপাসু শেখ হাসিনার পুলিশ বাহিনী আগুনে পুড়িয়ে দেয় তার দেহ।
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার কৈগ্রাম ফার্সিপাড়ার সন্তান বায়েজিদ। তিন ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেন মেজো। গরিব ঘরে জন্ম, তবুও শত কষ্টের মাঝে ছিল শান্তির সুবাতাস। রাজধানীর উত্তরা আইডিয়াল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পাশাপাশি একটি কারখানায় কাজ করে সামর্থ্য অনুযায়ী দাঁড়াতেন পরিবারের পাশে।
৫ আগস্ট দুপুরে কারফিউ ভেঙে মিছিলে যোগ দেন বায়েজিদ। মিছিল থেকেই মোবাইলে কথা বলেন মায়ের সঙ্গে। বলছিলেন ঢাকা ছেড়ে বাড়ি ফেরার কথা, জমানো টাকায় নতুন ঘর তোলার স্বপ্নের কথা। পুলিশের গুলিতে সেসময় আরেক সহযোদ্ধার মৃত্যুর খবরও দেন মাকে। সে সময় গুলির শব্দে ফোনের ওপারে আঁৎকে উঠেছিল মায়ের মন।
মিছিল থেকেই মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। এরপর আর সহজ-সাবলীল গলায় কথা বলা আদরের ছেলের ফোন পাননি মা। হাতের মুঠোয় আগলে রাখা ছোট্ট সে ফোনের দিকে তাকিয়ে আজও চমকে ওঠেন শোকে বিহ্বল মা বেনু আরা। এখনও গভীর রাতে মাঝেমাঝেই তাঁর কানে বাজে সেই রিংটোন... এই বুঝি ছেলের ফোন এলো।
বয়স কম হলেও বাবা হারা বায়েজিদ ছিলেন ভীষণ দায়িত্বশীল। পরিবারের দেখভাল থেকে শুরু করে আত্মীয়-পরিজনের কাছে তিনি ছিলেন ভরসার প্রতীক। সম্পর্ক আর মায়ায় গাঁথা সংসারে আজ সবাই আছেন, নেই শুধু সেই আস্থার নাম—বায়েজিদ।
মায়ের সঙ্গে ফোনালাপের পর আর কোনো খোঁজ মেলেনি বায়েজিদের। গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা পালানোর পর, আশুলিয়া থানার সামনের রাস্তায় গুলিবিদ্ধ ১৩ জনের দগ্ধ মরদেহ পাওয়া যায় পোড়া একটি গাড়িতে। সেখানেই মেলে বায়েজিদের পোড়া দেহ! ৫ আগস্ট বিকেলে গুলি করে হত্যার পর পুলিশই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল তাদের মৃতদেহে। স্থানীয়দের মোবাইলে ধারণ করা সেই নির্মম দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
দেশকে স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত করতে দরিদ্র ঘরের নিরীহ এক তরুণ—বায়েজিদ বোস্তামি—জীবন বাজি রেখে নেমেছিলেন রাজপথে। মিছিলে মিশেছিলেন, মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন পুলিশের বুলেটের সামনে। বায়েজিদ আর ফিরে না এলেও, হত্যাকারীদের প্রকাশ্য শাস্তি হলে হয়তো খানিকটা সান্ত্বনা খুঁজে পেতো তার পরিবারে।
শহীদ পরিবারটিকে সরকার ঘোষিত ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদানের কথা জানান জেলা প্রশাসন।
ছয় মাসের ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে আশুলিয়ায় থাকতেন বায়েজিদ বোস্তামি। সেদিন, আদরের সন্তান-স্ত্রীকে ঘরে রেখে, মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বন্ধুদের সঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন তিনি।
সেই যুবকদের পেছনে ফিরে তাকানোর কোনো গল্প ছিল না সেদিন। ছিল কেবল- এক বুক ভরা বাংলাদেশের পতাকা। সেইসাথে বারুদে ঠাসা স্লোগান আর ঝাঁঝালো কবিতার পঙক্তি—"বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি—গুলি কর!"
এই স্লোগানের উত্তাপে বড় হয়ে উঠবে বায়েজিদের ছোট্ট সন্তান রাফি আবদুল্লাহ— হয়তো একদিন সেও হয়ে উঠবে আরেক বায়েজিদ বোস্তামি!
আরও পড়ুন:








