শুক্রবার

৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২ কার্তিক, ১৪৩৩

তিন বছরে প্রায় ৫ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি, সুযোগ বাংলাদেশিদেরও

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৮:৩৬

শেয়ার

তিন বছরে প্রায় ৫ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি, সুযোগ বাংলাদেশিদেরও
ছবি সংগৃহীত

ইতালিতে আগামী তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে দেশটির সরকার। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের কর্মীদের জন্য মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০টি কর্মসংস্থানের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগে ভাষা শিক্ষা, নাগরিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইতালি। দেশটির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্যও প্রচলিত নিয়োগ কোটা ছাড়াই বৈধভাবে ইতালিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আর্টিকেল ২৩-এ কোটা ছাড়াই যাওয়ার সুযোগ

ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে বিদেশি কর্মীদের জন্য ভাষা, নাগরিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। এর লক্ষ্য ইতালির শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি এবং বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করা।

এই ব্যবস্থায় ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্তে প্রচলিত কর্মী নিয়োগের কোটা ব্যবস্থার বাইরে দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।

২০২৩ সালে ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন ও সংহতি নীতিবিষয়ক মহাপরিচালকের দপ্তর এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশিকা প্রণয়ন করে। ২০২৩ সালের ৭ জুলাই গৃহীত ওই নির্দেশিকায় প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন ও অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা যাচাইয়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের এক বা একাধিক দেশে পরিচালনা করতে হবে। এতে ইতালীয় ভাষার পাশাপাশি দেশটির সংবিধানের মৌলিক নীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও কার্যক্রম এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। ভাষা প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের অন্তত এ১ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

পেশাগত প্রশিক্ষণে সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার, পেশাগত পরিভাষা এবং চাকরি খোঁজার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

প্রশিক্ষণে কোনো ফি নেওয়া যাবে না

ইতালির নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো অর্থ, পারিশ্রমিক কিংবা ফি নেওয়া যাবে না। প্রশিক্ষণ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানকে বিনা মূল্যে এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোন পেশায় কতজন কর্মী প্রয়োজন, কোন খাতে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং কী ধরনের দক্ষতা দরকার, তা আগেই নির্ধারণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে ইতালীয় নিয়োগকর্তা ও কোম্পানিগুলোর সম্পৃক্ততার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ চলাকালে সম্ভাব্য চাকরির সুযোগ, কর্মসংস্থান চুক্তির শর্ত এবং ইতালিতে প্রবেশের পদ্ধতি সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের জানাতে হবে।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের পেশাগত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রশিক্ষণ সম্পন্ন ও নির্বাচিত ব্যক্তিদের তালিকা ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।

এসব প্রশিক্ষণ প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন ও সংহতি নীতিবিষয়ক মহাপরিচালকের দপ্তরে জমা দিতে হয়। একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিশন প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন ও অনুমোদন করে।

বাংলাদেশে আর্টিকেল ২৩ নিয়ে দূতাবাসের উদ্যোগ

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ তুলে ধরেছে ঢাকায় অবস্থিত ইতালির দূতাবাস।

বিশ্বব্যাপী ইতালীয় ভাষা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকায় ল্যাংগুয়েজ, সিভিক অ্যান্ড প্রফেশনাল ট্রেইনিং ফর স্কিলড মাইগ্রেশন টু ইতালি শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ইতালির দূতাবাস ও তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগী অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর সামনে ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ এবং দেশটির অভিবাসন আইনের সাম্প্রতিক বিধান তুলে ধরা হয়। এতে ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, নাগরিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়।

ইতালির ২০২৩ সালের নির্দেশিকায় বাংলাদেশের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের যেকোনো দেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশেও আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও আন্তসরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক সংস্থা, নিয়োগকর্তাদের সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এসব প্রকল্পের আবেদন করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণকেও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হয়।

তবে ৩ নভেম্বরের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় কতটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, কতজন প্রশিক্ষণ পাবেন কিংবা কতজন ইতালিতে কাজের সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

দূতাবাস জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতালিতে চাকরি বা ভিসা পাওয়া যাবে না। অনুমোদিত প্রকল্প, নিয়োগকর্তার সম্পৃক্ততা এবং দেশটির প্রযোজ্য অভিবাসন ও কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে ইতালিতে ২ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে ৮০ হাজার ওয়ার্ক পারমিট ভিসার আওতায় রয়েছেন।

তিন বছরে প্রায় ৫ লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা

অনুষ্ঠানে ইতালির সরকারি কর্মী নিয়োগের কোটা ব্যবস্থা দেক্রেতো ফ্লুসির পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিন বছরে সব মিলিয়ে ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী এসব কর্মী নেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের জন্যও সংরক্ষিত কোটা রয়েছে। তবে আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় অনুমোদিত ও সনদপ্রাপ্ত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্তে দেক্রেতো ফ্লুসির নির্ধারিত কোটা ছাড়াই ইতালিতে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এই প্রশিক্ষণে তিনটি বিষয় বাধ্যতামূলক। এগুলো হলো প্রাথমিক ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, ইতালি সম্পর্কে মৌলিক নাগরিক শিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রের পেশাগত দক্ষতা অর্জন। প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ থেকেই সম্পন্ন করতে হবে এবং এ জন্য কর্মীদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না।

অনুষ্ঠানে ফরম্যাটের প্রতিনিধি আন্তোনিও মিলো আর্টিকেল ২৩-এর পাঁচটি সুবিধার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় প্রচলিত কোটা ছাড়াই ইতালিতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং প্রশিক্ষণ বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। শুরু থেকেই ইতালি সরকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীরা ইতালীয় ভাষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে দেশটিতে যেতে পারবেন। আর যারা শেষ পর্যন্ত ইতালিতে যাবেন না, তাঁরাও অর্জিত দক্ষতা বাংলাদেশে কাজে লাগাতে পারবেন।

ভিসা ও দালালের খরচ নিয়ে সতর্কতা

অনুষ্ঠানে ইতালিতে যাওয়ার নামে প্রতারণার বিষয়েও সতর্ক করা হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ইতালির ভিসার সরকারি ফি ৫০ থেকে ১১৬ ইউরো। এর সঙ্গে ভিএফএসের ৩৮ ইউরো ফি যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ খরচ ১৫৪ ইউরো। অথচ একই ভিসার জন্য দালালরা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত নিচ্ছেন। এর বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

আয়োজকেরা বলেন, বৈধ পথে ইতালিতে যেতে তুলনামূলক কম খরচ হয়। দালালদের পেছনে অর্থ ব্যয় প্রতারণার শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ। আর্টিকেল ২৩-এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও কোনো খরচ নেই। এ কারণে দালালের পরিবর্তে ইতালির দূতাবাস ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ তথ্য অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

এদিকে ইতালিতে পৌঁছানোর আট দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশটির পুলিশ সদর দপ্তর কয়েস্তোরায় গিয়ে রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের পারমিট দেওয়া হবে, যা নবায়নযোগ্য। পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর স্থায়ী বা অনির্দিষ্ট মেয়াদের পারমিট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সূত্র: ইনফোমাইগ্র্যান্টস