রবিবার

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ৩ কার্তিক, ১৪৩৩

বাংলাদেশিদের সমুদ্রপথে অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে গ্রিস ও ইইউ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:৫১

শেয়ার

বাংলাদেশিদের সমুদ্রপথে অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে গ্রিস ও ইইউ
ছবি সংগৃহীত

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিশেষ করে লিবিয়া ও মিশল হয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ইউরোপে প্রবেশ বন্ধ করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ফ্লাইট চলাচলে কড়াকড়ি, অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।

শুক্রবার গ্রিসের সংবাদমাধ্যম কাথিমেরিনি এবং শনিবার অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গ্রিক সংবাদমাধ্যম গ্রিক সিটি টাইমসের দুটি পৃথক প্রতিবেদনে এসব উদ্যোগের বিস্তারিত উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে এক হাজারের বেশি অনিয়মিত অভিবাসী পৌঁছেছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইয়ারাপেত্রা উপকূলে অবতরণ করেন। এতে সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন নিয়ে গ্রিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রিসে সামগ্রিকভাবে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন ৬২ হাজার থেকে কমে ৪২ হাজারে নেমেছে। তবে সামগ্রিক সংখ্যা কমলেও লিবিয়া থেকে ক্রিটে পৌঁছানোর সমুদ্রপথটি ইউরোপের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে লিবিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি আশ্রয়প্রার্থী ও অনিয়মিত অভিবাসী অবস্থান করছেন। এ ছাড়া লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় সমুদ্রপথে মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকানো গ্রিসের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্রিক কর্তৃপক্ষ সুদানসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত অন্যান্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের অভিবাসনকে একইভাবে দেখছে না। তাদের যুক্তি, সুদানের নাগরিকেরা গৃহযুদ্ধ ও জীবনহানির ঝুঁকি থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়ছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টিকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। গ্রিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে, তাঁদের অনেকে উন্নত জীবন ও কাজের সন্ধানে আন্তর্জাতিক বিমানপথে প্রথমে বিভিন্ন দেশে যান। পরে সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশিদের যাতায়াতপথে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশিরা প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে যান। সেখান থেকে সংযোগকারী ফ্লাইটে মিশরের কায়রো কিংবা লিবিয়ার বেনগাজি ও ত্রিপোলি বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরপর তাঁদের কেউ কেউ মানবপাচারকারী চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার উপকূল থেকে ট্রলার বা নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ক্রিট দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় প্রাণহানির ঝুঁকিও রয়েছে।

এই পথে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে বাংলাদেশ, উপসাগরীয় দেশ এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে গ্রিস ও ইইউ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণপথ, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং অনিয়মিতভাবে গ্রিসে প্রবেশকারীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

গ্রিক সিটি টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়া ও মিশর হয়ে অনিয়মিত অভিবাসনের পথ বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাইছে গ্রিস ও ইইউ।

অন্যদিকে, কাথিমেরিনির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিয়মিত প্রবেশ ঠেকাতে লিবিয়া ও মিশরগামী ফ্লাইটের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ ও চাপ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিয়মিতভাবে গ্রিসে প্রবেশকারীদের পরিচয় শনাক্ত করে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে কায়রো, বেনগাজি ও ত্রিপোলিগামী ফ্লাইটে বাংলাদেশি যাত্রীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রানজিট সুবিধা ও টিকিটিং ব্যবস্থায় কড়াকড়ি আরোপ করা। এ বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সহযোগিতা চাইছে এথেন্স। তবে এসব বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন ও আশ্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবনা

আরেকটি উদ্যোগের লক্ষ্য, অনিয়মিতভাবে ইতোমধ্যে গ্রিসে প্রবেশ করা বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ চার্টার্ড বিমানে এসব অভিবাসীকে সরাসরি ঢাকায় ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

পাশাপাশি, অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন বন্ধ করতে গ্রিক সরকার আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ বা বিবেচনার স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার মতো পদক্ষেপের কথাও ভাবছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, কারা এর আওতায় পড়বেন এবং কীভাবে তা কার্যকর করা হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়।