বুধবার

১ জুলাই, ২০২৬ ১৭ আষাঢ়, ১৪৩৩

কম্বোডিয়া থেকে ফিরলেন আরও ১০৯ বাংলাদেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২৬ ১৩:৪১

আপডেট: ১ জুলাই, ২০২৬ ১৮:০৪

শেয়ার

কম্বোডিয়া থেকে ফিরলেন আরও ১০৯ বাংলাদেশি
ছবি সংগৃহীত

কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ১০৯ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এর মাধ্যমে গত চার দিনে মোট ৩৬২ জন এবং জুন মাসজুড়ে মোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরলেন। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। দেশে ফেরার পর সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে তাদের জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

ফিরে আসা এক ভুক্তভোগী জানান, কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র তার কাছ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেয়। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে কর্মভিসা না দিয়ে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আরেক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, সেখানে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হতো এবং নির্ধারিত টার্গেট পূরণ করতে না পারলে মারধর, শারীরিক নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় স্ক্যাম চক্রের সদস্যরা পালিয়ে গেলে তারা মুক্তি পান।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার স্ক্যাম বর্তমানে মানবপাচারের ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি জানান, উন্নত দেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফিরে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগী মামলা করেছেন বলে জানিয়ে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি ও আন্তর্জাতিক পাচারচক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে দেশে ফেরা ভুক্তভোগীদের দাবি, সেখানে এখনও হাজার হাজার বাংলাদেশি চাকরি না পেয়ে বা প্রতারণার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ব্র্যাক জানায়, জুনে ফিরে আসা ৫৮৩ জনের অনেকের কাছেই বিএমইটির ছাড়পত্র ছিল।

এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছিলেন। তাদেরও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত হয়ে মিয়ানমারে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করা হয়।

ব্র্যাকের ভাষ্য, কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ, কাস্টমার সার্ভিসসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়োগের প্রলোভন দেখানো হয়। পরে চাকরিপ্রার্থীদের স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়। এ কারণে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে চাকরির সত্যতা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ভিসার ধরন যাচাই করে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ব্র্যাক।

এদিকে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গার পারধারী গ্রামের কিশোর শহীদুলকে একই গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী সোহাগ ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়া নেওয়ার স্বপ্ন দেখান। ভিসা ও বিমান টিকিটসহ সব খরচ মিলিয়ে ৭ লাখ টাকা লাগবে বলে জানানো হয়। বাড়ি ও গরু বিক্রি করার পাশাপাশি ঋণ করে টাকা জোগাড় করে তা তুলে দেন শহীদুল। কিন্তু শহীদুলের অভিযোগ, তাকে টুরিস্ট ভিসায় বিদেশে নিয়ে একটি অবৈধ ক্যাসিনোতে কাজ দেওয়া হয় এবং প্রকৃতপক্ষে প্রতিশ্রুত কোম্পানির অস্তিত্বই ছিল না। বিদেশে পৌঁছানোর পর তাকে এক দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

শহীদুলের মতো আরও পাঁচটি পরিবার সন্তানের উন্নত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গোয়ালের গরু ও আবাদি জমি বিক্রি করে টাকা দিয়েছিল। সব হারিয়ে দেশে ফিরে আসা এসব পরিবার এখন তাদের অর্থ ফেরত চাইছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর ভাষ্য, তাদের কাছ থেকে গবাদিপশু বিক্রির অর্থ নিয়ে মাসে এক লাখ টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযুক্ত সোহাগ হোসেন টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং চাপ দেওয়া হলে থানায় মামলার হুমকি দিয়েছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সোহাগ হোসেনের বাড়িতে গেলে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি কেউ। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সলঙ্গা ছাড়াও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও বেলকুচিতে দালাল চক্র যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।



banner close
banner close