রবিবার

৩ মে, ২০২৬ ২০ বৈশাখ, ১৪৩৩

লন্ডনের ৪ সিটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ২৯৭ প্রার্থীর ভোটযুদ্ধ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩ মে, ২০২৬ ০৬:১৯

শেয়ার

লন্ডনের ৪ সিটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ২৯৭ প্রার্থীর ভোটযুদ্ধ
ছবি সংগৃহীত

পূর্ব লন্ডনের বহুজাতিক জনপদে আবারও গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহ। টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, রেডব্রিজ ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম—এই চার বরোকে ঘিরে আসন্ন ৭ মে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের এক তাৎপর্যপূর্ণ মঞ্চ। এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের বহুমাত্রিক উপস্থিতি এরই মধ্যে নির্বাচনী সমীকরণ জটিল ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, চারটি বরোর ৮৫টি ওয়ার্ডে ২২৫টি কাউন্সিলর পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রায় এক হাজার প্রার্থী।

তাঁদের মধ্যে ২৯৭ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। টাওয়ার হ্যামলেটস বরাবরের মতোই এই প্রবণতার কেন্দ্রস্থল। ২০টি ওয়ার্ডে ৪৫টি আসনের বিপরীতে ১২১ জন বাংলাদেশি প্রার্থীর অংশগ্রহণ এখানকার জনমিতিক বাস্তবতাই প্রতিফলিত করে। নিউহামেও একই চিত্রের প্রতিফলন, যদিও সেখানে প্রতিযোগিতার রূপ কিছুটা ভিন্ন।

২৪টি ওয়ার্ডে ৬৬টি আসনের জন্য লড়ছেন ৮৭ জন বাংলাদেশি প্রার্থী। রেডব্রিজে নির্বাচনী লড়াই আরো বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। ২২টি ওয়ার্ডে ৬৩টি আসনের বিপরীতে প্রায় ৩০০ প্রার্থীর মধ্যে ৫৫ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। অন্যদিকে বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের মধ্যেও বাংলাদেশি প্রার্থীদের সক্রিয়তা দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

১৯টি ওয়ার্ডে ৫১টি আসনের জন্য প্রায় ২০০ প্রার্থীর মধ্যে ৩৪ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। এটি শুধু একটি সংখ্যাগত উপস্থিতি নয়, বরং একটি ক্রমবিকাশমান রাজনৈতিক সত্তার ইঙ্গিত। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় প্ল্যাটফর্ম, আঞ্চলিক উদ্যোগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থিতার বিস্তার এই নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে প্রথাগত দলীয় সমীকরণের বাইরে গিয়ে ভোটারদের সামনে তৈরি হয়েছে বহুবিকল্পের এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় বাস্তবতা।

টাওয়ার হ্যামলেটস বরাবরের মতোই এই প্রবণতার কেন্দ্রস্থল।

এখানে বর্তমানে নির্বাহী মেয়র লুত্ফুর রহমানের নেতৃত্ব, অ্যাসপায়ার পার্টি ও টাওয়ার হ্যামলেটস ইনডিপেনডেন্টের সক্রিয়তা এবং লেবার পার্টির পক্ষ থেকে সিরাজুল ইসলামসহ মেয়র ও কাউন্সিলর পদে অসংখ্য বাংলাদেশি প্রার্থীর মনোনয়ন—সব মিলিয়ে এই বরোতে বাংলাদেশি রাজনৈতিক উপস্থিতি এক সুসংহত রূপ পেয়েছে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য রুশনারা আলী ও আপসানা বেগমের মতো নেতৃস্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে এই ধারাবাহিকতার যোগসূত্র স্থাপন করেছে। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, এখানকার মোট জনসংখ্যার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বাংলাদেশি, যা নির্বাচনী প্রভাবের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারক উপাদান।

নিউহামে লেবার, কনজারভেটিভ ও গ্রিন পার্টির পাশাপাশি ‘নিউহাম ইনডিপেন্ডেন্ট’ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এখানে রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে আরো দৃশ্যমান করেছে। মেয়র পদে ফরহাদ হোসেন ও আরিক চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই বৈচিত্র্যেরই প্রতীক। প্রায় সাড়ে তিন লাখ জনসংখ্যার এই বরোতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশির বসবাস। প্রায় দুই লাখ ভোটারের সমীকরণে তাঁদের অবস্থান নিঃসন্দেহে প্রভাবশালী।

রেডব্রিজে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের পাশাপাশি গ্রিন পার্টি ও বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম থেকেও অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। তিন লাখের বেশি মানুষের এই বরোতে প্রায় ৩৫ হাজার বাংলাদেশির উপস্থিতি এবং বিশেষ করে ইলফোর্ড অঞ্চলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উত্থান নির্বাচনী ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

অন্যদিকে বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহামে লেবার, কনজারভেটিভ ও গ্রিন পার্টির প্রার্থীদের মধ্যেই তাঁদের উপস্থিতি বেশি। প্রায় দুই লাখ ১৫ হাজার মানুষের এই বরোতে ২০ থেকে ২৫ হাজার বাংলাদেশির বসবাস; এবং সাবেক মেয়র মঈন কাদরীর দলবদল করে গ্রিন পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।,

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, চারটি বরোতেই লেবার পার্টি প্রধান শক্তি হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও কনজারভেটিভ, গ্রিন, লিবারেল ডেমোক্রেটিকস এবং বিভিন্ন স্বতন্ত্র ও স্থানীয় প্ল্যাটফর্মের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বহুমাত্রিক করে তুলেছেন। বিশেষত টাওয়ার হ্যামলেটস ও নিউহামে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আধিক্য নির্বাচনের প্রচলিত হিসাব-নিকাশকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই নির্বাচন শুধু কাউন্সিলর নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আত্মপ্রত্যয়ের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। প্রার্থীর সংখ্যাগত আধিক্যের পাশাপাশি ভোটার হিসেবে তাঁদের প্রভাবও ক্রমেই নির্ণায়ক হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও নতুন নেতৃত্বের উত্থান অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।



banner close
banner close