মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের ভিসার জন্য ন্যূনতম বেতনসীমা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। আগামী ১ জুন থেকে কার্যকর এই নতুন নীতিমালায় ক্যাটাগরি অনুযায়ী বেতনসীমা পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অবস্থানকাল পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়াতে মালয়েশিয়া ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট শ্রমশক্তিতে বিদেশি কর্মীর হার বর্তমান ১৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। এতে দেশটিতে কর্মরত আট লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা বন্ধ রয়েছে, যা পুনরায় চালু করতে এখনো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশটিতে আট লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে অবৈধভাবে আরও কয়েক লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশি কর্মীদের একটি বড় অংশ সাধারণ শ্রমিক হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পেশাজীবী এমপ্লয়মেন্ট পাস ভিসায় বিভিন্ন খাতে কর্মরত।
নতুন নিয়মে এমপ্লয়মেন্ট পাসের তিনটি ক্যাটাগরিতে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য ন্যূনতম মাসিক বেতনসীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরি-১-এর ক্ষেত্রে ১০ হাজার রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার রিঙ্গিত করা হয়েছে। ক্যাটাগরি-২-এর বেতন ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত এবং ক্যাটাগরি-৩-এর ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে ৯ হাজার ৯৯৯ রিঙ্গিত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম দুই ক্যাটাগরির ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং তৃতীয় ক্যাটাগরির ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। নিয়োগকর্তাদের প্রবাসীর মেয়াদ শেষে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্টারের তথ্যমতে, গত বছর জুন শেষে কাজের অনুমতি থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল আট লাখ তিন হাজার ৩৩২ জন। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে অনেকে দেশটিতে থেকে যাওয়ায় বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
মালয়েশিয়া সরকারের ২০২৫ সালে প্রকাশিত জাতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, স্বল্পদক্ষ বিদেশি শ্রমিকের ওপর ক্রমাগত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির গতি শ্লথ করেছে। এ পরিস্থিতি শ্রমবাজারে কম দক্ষ ও কম মজুরির কাজের আধিক্য সৃষ্টি করেছে এবং উৎপাদনশীলতার ধীর প্রবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। জানুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, উচ্চ বেতনভোগী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করা হবে। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় প্রতিভা বিকাশ জোরদার করাই এর লক্ষ্য।
মালয়েশিয়ার সানওয়ে ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ড. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশটিতে কর্মরত পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের পরিকল্পনা নিয়ে আসায় নতুন নীতিতে বিকল্প গন্তব্য ভাবতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পক্ষে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন কঠিন হবে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মীদের বাদ দিয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিতে বাধ্য হবে।
মালয়েশিয়ার এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শাহরিয়ার বণিক বার্তাকে জানান, নতুন অভিবাসন নীতিতে বড় প্রভাব পড়বে। খুব বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন না হলে নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশিদের আর কাজে রাখবেন না। তারা তুলনামূলক কম বেতনে স্থানীয়দের নিয়োগ দেবে, কারণ সেখানে চাকরির সংকট রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বণিক বার্তাকে বলেন, মালয়েশিয়ায় যেসব পেশাজীবী রয়েছেন তাদের কাজের দক্ষতা খুব ভালো না হলে দেশে ফিরতে হতে পারে। নিয়োগকর্তারা কম বেতনে স্থানীয় নিয়োগের কথা ভাববেন, যা বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের জায়গা সংকুচিত করবে। পেশাজীবী ক্যাটাগরিতে মালয়েশিয়ার বাইরে অন্য গন্তব্য খুঁজতে সরকারকে এখনই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স আহরণের দিক থেকে মালয়েশিয়া বর্তমানে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২০৩ কোটি ১৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ডলার।
আরও পড়ুন:








