ঘুম থেকে উঠেই মাথাব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা সারাদিন দুর্বল অনুভব—এ ধরনের সমস্যায় ভুগছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অন্যতম প্রধান কারণ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। সুস্থ শরীর ও স্বাভাবিক মানসিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট সময়ের ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এর কম ঘুম হলে শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ঘুমের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে অবসাদ, উদ্বেগ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যার কারণ হতে পারে।
তবে সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য কেবল ঘণ্টা হিসেবে নয়, এমন ঘুম হওয়া জরুরি যা শরীরকে সতেজ রাখবে। সকালে ঘুম থেকে জেগে সতেজ লাগা জরুরী। কারণ, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এ ধরনের ঘুম খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের ঘুমের সমস্যা থাকে, তাদের ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ঘুমের সমস্যার মধ্যে আছে ইনসমনিয়া বা স্লিপ অ্যাপনিয়া। এসব সমস্যা যাদের নেই, তাঁদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই কম। অসম্পূর্ণ ঘুম মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ বা ৪০ বছর বয়সে যারা ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা ভোগেন, এক দশক পরে মস্তিষ্কের কর্মক্ষম স্মৃতি (এক্সিকিউটিভ মেমোরি), কর্যকরী স্মৃতি (ওয়ার্কিং মেমরি) এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গভীর ঘুম এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির ক্ষেত্রেও এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা গভীর ঘুম এবং আরইএম ঘুমের ঘাটতিতে ভুগছিলেন, ১৩ থেকে ১৭ বছর পর তাঁদের মস্তিষ্কে অ্যাট্রফির লক্ষণ দেখা গেছে। এমআরআই স্ক্যান করলে আলঝেইমার রোগের প্রাথমিক লক্ষণের সঙ্গে অ্যাট্রফির মিল আছে।,
ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক ধারাবাহিকভাবে চারটি ভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। সেগুলো হলো দুইটি হালকা ঘুমের ধাপ, একটি ডিপ স্লিপ ও আরইএম স্লিপ। হালকা ঘুমের ধাপে শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা কমে আসে। এরপর আছে ডিপ স্লিপ বা স্লো-ওয়েভ ঘুম, যেখানে মস্তিষ্কের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সবশেষে আছে আরইএম, যেখানে আমরা সাধারণত স্বপ্ন দেখি। চারটি ধাপ শেষ হতে সাধারণত ৯০ মিনিট লাগে। এরপর আবার নতুন করে চক্রটি শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সকালে মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং দুর্বলতা দেখা দেয়। দিনের বেলায় কাজের সময় ঝিমুনি, মনোযোগের ঘাটতি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। এমনকি নিয়ম মেনে চললেও অনেকের ওজন বেড়ে যেতে পারে, যার পেছনেও ঘুমের অভাব বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি হজমক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় শরীরে আরও নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ঘুমের ব্যাঘাতের আরেকটি লক্ষণ হিসেবে নাক ডাকার কথাও উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকরা। অনেকেই এটিকে গভীর ঘুমের লক্ষণ মনে করলেও বাস্তবে এটি অপর্যাপ্ত বা ব্যাহত ঘুমের ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে ঘুমের সমস্যা সমাধানে ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বরং কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে স্বাভাবিকভাবেই ভালো ঘুম সম্ভব।
ঘুম ভালো করতে করণীয় হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন—ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে মোবাইল বা টিভি ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা এবং কফি বা চা কম পান করাও জরুরি। খাবারের পর অল্প সময় হাঁটাচলা করলে দ্রুত ঘুম আসতে সহায়তা করে।
এছাড়া কিছু প্রাকৃতিক খাবারও ভালো ঘুমে সহায়ক হতে পারে। কাজুবাদাম, মধু, কলা, চেরি ফল ও দুধ—এসব খাবারে থাকা বিভিন্ন পুষ্টিগুণ ঘুমের মান উন্নত করতে ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা গেলে শুধু ক্লান্তি দূর হয় না, বরং শরীর ও মন দুটিই সুস্থ থাকে। দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনের জন্য তাই ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন:








