রবিবার

৮ নভেম্বর, ২০২৬ ২৪ কার্তিক, ১৪৩৩

ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি বেড়েছে ৯৩ শতাংশ, মৃত্যু ৫০ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:১৮

শেয়ার

ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি বেড়েছে ৯৩ শতাংশ, মৃত্যু ৫০ শতাংশ
ছবি সংগৃহীত

চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০ জন। মারা গেছেন ৪৫৮ জন। গত বছরের একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭৬ হাজার ৫১৪ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৩০৭ জন।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থান

দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাসে চলতি বছরের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০০ সালে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর কেবল ২০২৩ সালে এর চেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে চলতি বছর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন এবং ২০২৪ সালে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৭৪ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৮২৬ জন ডেঙ্গু রোগী।

অক্টোবরে এক মাসে সর্বোচ্চ ১৭৪ জনের মৃত্যু

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। ওই মাসে মারা যান ১৪৮ জন। তবে অক্টোবরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৪ জনে, যা চলতি বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ প্রাণহানি।

নভেম্বরের প্রথম সাত দিনেই ডেঙ্গুতে আরও ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মহামারি সংক্রান্ত বুলেটিনেও বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের এই বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।

মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর মশকনিধন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলো বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, টুকরো টুকরো বা দায়সারা ব্যবস্থা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, মশকনিধন কার্যক্রমে নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তিনি বলেন, জনসচেতনতা ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু শনাক্তে বিলম্ব এবং দেরিতে হাসপাতালে ভর্তির প্রবণতা রোগীদের জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকিরের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় ১১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া রোগীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছেন।

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মোট মৃত্যুর ৬২ দশমিক ৫ শতাংশের কারণ ছিল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। আর ৩১ দশমিক ২ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম।

চিকিৎসকদের মতে, জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়াই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর কারণে অনেক রোগী হাসপাতালে আসার আগেই সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছেন।

গত কয়েক বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সালে। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ৯৩ জন।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। ওই বছর মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে বছরজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন।