শুক্রবার

৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২ কার্তিক, ১৪৩৩

বাজেট বাড়লেও কেন বাড়ে না চিকিৎসার মান?

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ১৮:৩৩

শেয়ার

বাজেট বাড়লেও কেন বাড়ে না চিকিৎসার মান?
ছবি সংগৃহীত

অসুস্থ হলেই কি নিশ্চিত হয় চিকিৎসা? নাকি চিকিৎসা নিতে গিয়েই নিঃস্ব হতে হয় সাধারণ মানুষকে? বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা যেন প্রতিদিনই সামনে আনছে এমনই এক কঠিন প্রশ্ন। একদিকে চিকিৎসার আকাশছোঁয়া ব্যয়, অন্যদিকে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অকার্যকারিতা আর অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি। ফলে অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়াটাই পরিণত হচ্ছে এক নির্মম বাস্তবতায়। এমনটাই মনে করছে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা রোগীর কাঁধে

এদিকে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই বহন করতে হয় রোগী ও তাঁর পরিবারকে। অর্থাৎ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিজের পকেট থেকেই গুনতে হয় বড় অঙ্কের টাকা। কিন্তু উন্নত অনেক দেশে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের চিকিৎসার ব্যয় কমাতে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। রয়েছে সরকারি সহায়তা ও স্বাস্থ্যবিমাও।

তথ্য বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দরিদ্র নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প আয়ের যোগ্য নাগরিক, শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে মেডিকেইড। কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিরা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে। থাইল্যান্ডে রয়েছে ইউনিভার্সাল কভারেজ স্কিম বা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ ব্যবস্থার আওতায় দেশটির ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার আওতায় রয়েছে।

অন্যদিকে জাপানেও রয়েছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় নাগরিকরা নিয়মিত বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন এবং চিকিৎসা নেয়ার সময় ব্যয়ের একটি নির্ধারিত অংশ নিজেরা বহন করে। বাকি অংশ বহন করে বিমা ব্যবস্থা।

অথচ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৫৪। যেখানে ভারতের স্কোর ৬৯, নেপালের ৫৮ এবং শ্রীলঙ্কার ৭২। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সব থেকে বেশি পিছিয়ে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের স্কোরও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ—বিআইডিএসের ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপভিত্তিক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষণা অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণেই প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি হলে রোগীপ্রতি মাথাপিছু ব্যয় দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ১৩৪ টাকা। আর চিকিৎসার পেছনে নিজের পকেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে পড়ছে দেশের দরিদ্র মানুষরা।

হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনা

শুধু চিকিৎসার ব্যয়ই নয়, হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সুস্থ হওয়ার আশায় হাসপাতালে এসে রোগীদের প্রায়ই মোকাবিলা করতে হয় অপরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড, দুর্গন্ধযুক্ত শৌচাগার, ময়লা-আবর্জনা, পর্যাপ্ত পানির অভাব এবং চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।

ঢাকার ১২টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ২ হাজার ৪৫৯টি শৌচাগার পরীক্ষা করে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বি-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র। এতে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালের মাত্র ৩৩ শতাংশ শৌচাগার পরিচ্ছন্ন। এমনকি গবেষণায় পরিদর্শন করা সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের শৌচাগারগুলোর কোনোটিকেই পরিচ্ছন্ন পাওয়া যায়নি। বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র তুলনামূলক ভালো হলেও সেখানেও রয়েছে পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি। গবেষণায় বেসরকারি হাসপাতালের ৫৬ শতাংশ শৌচাগার পরিচ্ছন্ন পাওয়া যায়। আর পরিবেশগত এসব দুরবস্থা এবং অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার কারণেই হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ পড়ছে চরম ভোগান্তিতে।

এদিকে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনার পার্থক্য যেন আকাশ-পাতাল। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস—এনএইচএসে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে রয়েছে জাতীয় মানদণ্ড। কোন জায়গা কত ঘন ঘন পরিষ্কার করতে হবে, কীভাবে পরিচ্ছন্নতার মান যাচাই হবে এবং দায়িত্ব কার—সবকিছুরই রয়েছে নির্দিষ্ট কাঠামো। সিঙ্গাপুরেও হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা।

অপরদিকে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা থাকলেও তা যথাযথভাবে পালন করা হয় না বলেই সমালোচনা রয়েছে। এর আগে রাজধানীর মিরপুর-১-এ লালকুঠি বাজারের মাজার রোডে অবস্থিত মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে এক অনুসন্ধানে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ও করিডোরে ময়লা-আবর্জনায় ভরা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের চিত্র উঠে এসেছিল।

সে সময় হাসপাতালের এমন পরিবেশবহির্ভূত অবস্থার ব্যাপারে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে বাস্তবতার বিপরীতে গিয়ে অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় এ হাসপাতালের পরিবেশ অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন বলে দাবি করেন তিনি।

শুধু তাই নয়, চারদিকে যখন অর্থের অভাবে সাধারণ মানুষের ওষুধ কিনতে না পারার হাহাকার, তখন মিরপুরের এই হাসপাতালের আন্ডারগ্রাউন্ডে লাখ লাখ টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে থাকার চিত্র উঠে আসে সেই অনুসন্ধানে।

অপরদিকে হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়ে পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে, কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

হাসপাতালের এমন অব্যবস্থাপনায় এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্রমেই জন্ম নিচ্ছে তীব্র ক্ষোভ।

সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি

একইভাবে, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায়ও সামনে এসেছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতির চরম ঘাটতি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রাণহানির ঘটনা স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১টি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৯৭টি ছিল নিশ্চিত সংক্রমণ। একই সময়ে সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৬৬। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

একইভাবে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন-এর প্রতিবেদনেও। সংস্থাটির বুধবার (১৪ অক্টোবর) ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৫৭০ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণ ২২ হাজার ৮৪০টি। একই সময়ে সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩ জনে। এ ছাড়া টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং টিকার সংকট এই সংক্রমণকে আরও জটিল করে তোলে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

তবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবহেলার কারণেই হামের সংক্রমণ দেশে পঙ্গপালের ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে।

শুধু হামই নয়, ডেঙ্গু মোকাবিলাতেও সামনে আসছে একই ধরনের প্রশ্ন। মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলোর বিপুল ব্যয় ও নানা কর্মসূচির পরও কমছে না ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল। তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১৮ জনে। হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। শুধু অক্টোবর মাসেই মৃত্যু হয় ১৭৩ জনের। সেপ্টেম্বর মাসে এ সংখ্যা ছিল ১৪৮।

একদিকে হাম ও ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ। অন্যদিকে একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও কোনো সিট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত রোগীর ঠাঁই হচ্ছে হাসপাতালের করিডোর কিংবা সিঁড়ির নিচে। এমনকি বারান্দাতেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক রোগী। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব হাসপাতালেই একই চিত্র। সেই সঙ্গে সামনে আসছে স্বজনদের সীমাহীন হতাশা আর দীর্ঘ আর্তনাদ।

বিশাল বাজেটের পরও প্রশ্ন রয়েছে

হাসপাতালগুলোতে এমন অব্যবস্থাপনার মাঝেই প্রতিবছর স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বিপুল অর্থ। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে ৫০১ কোটি টাকা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, স্বাস্থ্য খাতে এত বিশাল বাজেট থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সংক্রমণ প্রতিরোধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কেন ব্যর্থতার আলামত? আর এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কোথায়, কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অনেক বিশ্লেষক। এতসব কিছু মাথায় রেখে, উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ে উঠবে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, এমন স্বপ্নই দেখে এদেশের কোটি কোটি মানুষ।