বুধবার

১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩

কমিউনিটি ক্লিনিক ক্লিনিক্যালি ডেড

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৪

আপডেট: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৮

শেয়ার

কমিউনিটি ক্লিনিক ক্লিনিক্যালি ডেড
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দেশের ১৪ হাজার ৪৭৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন সংস্কার বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং অনিয়মিত কার্যক্রমের কারণে ব্যাহত হচ্ছে প্রান্তিক মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এই উদ্যোগের আওতায় থাকা অনেক ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে রোগীদের।

৫ হাজারের বেশি ভবন সংস্কারের প্রয়োজন

সরকারি হিসাবে, দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ নেন। অথচ এসব ক্লিনিকের ৫ হাজারের বেশি ভবনের সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। কোথাও ছাদের রড বেরিয়ে গেছে, কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা ও সিমেন্ট-বালু। কোনো ভবনের জানালা ভাঙা, কোথাও বৃষ্টির পানি ঢুকছে, আবার কোথাও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছু ক্লিনিক পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

খুলনার কয়রা সদর ইউনিয়নের উত্তর মদিনাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাও বেহাল। ছাদ ও দেয়ালে ফাটল ধরেছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। ভবনের ভেতরে জমেছে আবর্জনা। ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এক বছর ধরে পাশের একটি বাড়ির বারান্দায় বসে রোগী দেখছেন কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) প্রকৃতি গাইন। নষ্ট রক্তচাপ মাপার যন্ত্রের কারণে সেখানে রোগীদের রক্তচাপ মাপা সম্ভব হচ্ছে না। ওষুধ সংরক্ষণেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাঁকে।

কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুজ্জোহা জানিয়েছেন, জরাজীর্ণ ভবনগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রায় ৬ হাজার ভবন পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করা হবে। যেসব ভবন একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী, সেসব ক্লিনিকের কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে অন্য স্থানে চালানো হচ্ছে।

ভবনগুলোর বেহাল দশা নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। গত জুনে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জমি পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে আরও ৫৪০টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে। সে হিসাবে ভবনগুলোর বয়স সর্বোচ্চ ২৪ থেকে ২৮ বছর। এর মধ্যেই অনেক ভবন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় নির্মাণকাজের মান ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ভবন নির্মাণের বিধিবিধান মেনে চললে সেগুলো কমপক্ষে ৫০ বছর ব্যবহার উপযোগী থাকার কথা। এত দ্রুত ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার কথা নয়। নির্মাণের সময় উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এবং পরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ভেঙে যেতে পারে বা দেবে যেতে পারে।

নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম চালু হয় ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল। শুরুতে ক্লিনিকগুলো কমিউনিটি-বেজড হেলথকেয়ার (সিবিএইচসি) কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ২০১৮ সালে কার্যক্রম টেকসই করতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্ট আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে এসব ক্লিনিক পরিচালিত হয়ে আসছে।

নির্ধারিত সময়ে খোলা থাকছে না ক্লিনিক

নিয়ম অনুযায়ী, কমিউনিটি ক্লিনিক সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্লিনিকে এই সময়সূচি মানা হচ্ছে না। কোনোটি সকাল ১০টার পর খুলে দুপুর ১২টার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। কোনোটি আবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চালু থাকে। ফলে অনেক জায়গায় দিনে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা সেবা দেওয়া হচ্ছে। সপ্তাহে ছয় দিন খোলা রাখার নিয়ম থাকলেও কোনো কোনো ক্লিনিক সপ্তাহে দু-তিন দিনের বেশি খোলা থাকে না।

সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌর শহরের একটি কমিউনিটি ক্লিনিকেও এমন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সপ্তাহে দু-তিন দিন মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা কার্যক্রম চলে। এতে সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ক্লিনিকটির পাশের বাসিন্দা বিলকিছ বেগমের অভিযোগ, চিকিৎসক নিয়মিত আসেন না। বেলা ১১টায় এলেও দুপুর ১টার আগে চলে যান।

কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুজ্জোহা জানিয়েছেন, সেবাদাতাদের উপস্থিতি ও সেবা নিশ্চিত করতে আকস্মিক পরিদর্শন করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, বেশির ভাগ জায়গায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে বেতন কর্তন, বন্ধ বা সাময়িক বরখাস্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ক্লিনিকের তুলনায় কম জনবল

সেবাদাতাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ থাকলেও কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা অনুযায়ী জনবল পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে ১৪ হাজার ৪৭৫টি ক্লিনিকের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৩ হাজার ৮৭৮ জন। অনিয়মের অভিযোগে তাঁদের মধ্যে ৪০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডারের সপ্তাহে ছয় দিন সেবা দেওয়ার কথা। পাশাপাশি একজন স্বাস্থ্যসহকারী ও একজন পরিবারকল্যাণ সহকারীর সপ্তাহে দুদিন করে সেবা দেওয়ার কথা রয়েছে।

জনবল সংকটের বিষয়ে এ কে এম ফজলুজ্জোহা বলেন, ২০২৪ সালের পর ট্রাস্টের আর কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে নতুন করে জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

বিনামূল্যের ওষুধ পাচ্ছেন না রোগীরা

প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন সেবা নেন। তাঁদের ৮০ শতাংশ নারী ও শিশু। এসব ক্লিনিকে ২২ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে রোগীদের অভিযোগ, অনেক সময় দুই থেকে তিন ধরনের বেশি ওষুধ পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে ফিরে যেতে হয় তাঁদের।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাসিন্দা সানোয়ার খাঁ বলেন, ওষুধ নিতে এসে তিনি তা পাননি। ক্লিনিকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাঁকে ওষুধ নেই বলে জানিয়েছেন। আগে এখান থেকে ভালো সেবা পেলেও এখন আর তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এ কে এম ফজলুজ্জোহা দাবি করেছেন, বর্তমানে ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় কয়েক ধরনের ওষুধের চাহিদা বেশি দেখা গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন সহায়তা বাবদ ৪৪০ কোটি টাকা এবং পণ্য সহায়তার জন্য ২২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। দুই খাতে মোট বাজেট ৬৬০ কোটি টাকা।

কমিউনিটি ক্লিনিককে হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা

দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নতুনভাবে সাজাতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার।

তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে হেলথকেয়ার ইউনিট থাকবে। প্রতিটি ইউনিটের অধীনে থাকবে তিনটি করে কমিউনিটি হাব। বর্তমানে চালু থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে এসব হাবে রূপান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।