বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

দশ জেলায় আইসিইউ চালু হলেও জনবল সংকটে সেবা বাধাগ্রস্ত

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৪৮

শেয়ার

দশ জেলায় আইসিইউ চালু হলেও জনবল সংকটে সেবা বাধাগ্রস্ত
ছবি বাংলা এডিশন

জেলা শহরের সাধারণ ও সংকটাপন্ন মানুষের আইসিইউ সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক মহা-পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। জরুরি রেসপন্স ও মহামারি প্রস্তুতি বা ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় দেশের ১০টি জেলা সদর হাসপাতালে আধুনিক আইসিইউ স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

রবিবার (১৪ জুন) দেশের ১০টি জেলা হাসপাতালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আইসিইউ সেবা উদ্বোধন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ও বিশেষ বাজেটে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, শেরপুর, যশোর ও বাগেরহাট। এছাড়াও চুয়াডাঙ্গা, মাদারীপুর, সুনামগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ টাঙ্গাইল ও গোপালগঞ্জ জেলা হাসপাতাল। কিন্তু কোটির অঙ্কে নির্মিত এই আইসিইউ ইউনিটগুলো বাস্তবে কতটা সেবা দিতে পারছে? নাকি লোকবল আর ব্যবস্থাপনার গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে রোগীদের জীবন?

নারায়ণগঞ্জে সেবা চালু

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রবিবার (১৪ জুন) সারা দেশের সাথে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নতুন করে ফের চালু হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ। সরকারের সরাসরি সহযোগিতায় পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহ করায় বর্তমানে এখানে ডেঙ্গু, কিডনি বিকল, হার্টের সমস্যা, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা এবং উচ্চ রক্তচাপের সংকটাপন্ন রোগীদের নিয়মিত জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে আশার আলো দেখছে স্থানীয়রা।

নিয়মিত সেবা ব্যাহত না হলেও আইসিইউ-র সার্বিক পরিচালনায় সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে বলে জানান নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ মেডিকেল অফিসার ডা. ফয়সাল রহমান।

শেরপুরে তীব্র জনবল সংকট

নারায়ণগঞ্জে সেবা চালু হলেও বিপরীত চিত্র শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে। করোনা মহামারির সময় প্রায় ২১ কোটি টাকা বাজেটে নির্মিত ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিটটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রবিবার (১৪ জুন) উদ্বোধন করা হয়।

এতে স্থানীয় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাঁদের মতে, এতদিন দূর-দূরান্তে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার কারণে একদিকে যেমন মূল্যবান সময় অপচয় হতো, অন্যদিকে বহন করতে হতো বিপুল আর্থিক ব্যয়।

কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো ও আধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত থাকলেও চরম জনবলসংকটে পড়েছে ১০ শয্যাবিশিষ্ট এই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি। সুবিশাল এই আইসিইউর চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে বর্তমানে নিযুক্ত রয়েছেন মাত্র একজন চিকিৎসক।

একক প্রচেষ্টায় একজন চিকিৎসকের পক্ষে ১০টি মুমূর্ষু রোগীকে সামলানো কতটা অসম্ভব, তা বোঝা কঠিন নয়। হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে চাওয়া হয়েছে মোট ৫৬ জন জনবল, কিন্তু মিলছে না সমাধান।

চুয়াডাঙ্গায় স্বস্তি ও সংকট

এবার চোখ রাখা যাক দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতালে। সেখানে অবশেষে আইসিইউ সেবা চালু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করছে রোগী ও তাদের স্বজনরা।

তবে সেবা মিললেও জনবল সংকটের কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত ও পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বাগেরহাটে চার মাস ধরে সচল

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বাগেরহাটে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে গত প্রায় চার মাস ধরে সচল রয়েছে আইসিইউ সেবা। বর্তমানে সেখানে ভর্তি রয়েছে ৫ জন মুমূর্ষু রোগী। খুলনা বা ঢাকায় রোগী স্থানান্তরের হার কমায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে স্বজনরা।

তবে এই অর্জনের পেছনেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র লোকবল সংকট।

যশোরে অকেজো বেড ও অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি

কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও হতাশাজনক চিত্র পাওয়া গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। জানা যায়, প্রতিদিন এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ৮’শ থেকে ১ হাজার রোগী। করোনাকালে সাজেদা ফাউন্ডেশনের সহায়তায় যে ১০ বেডের আইসিইউ চালু হয়েছিল, তার ৩টি বেডই এখন অকেজো। বাকি ৭টি বেড চলছে প্রয়োজনীয় জনবলের মাত্র তিনভাগের একভাগ কর্মী দিয়ে।

তবে চমক লুকিয়ে আছে হাসপাতালের করোনারি ইউনিটের চার তলায়।

করোনাকালে আসা কোটি কোটি টাকার আধুনিক আইসিইউ সরঞ্জাম ২০২১ সাল থেকে ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে চার তলার বন্ধ কক্ষে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বর্জ্য এবং চরম অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

এদিকে জনবল সংকটের কারণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আইসিইউ সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

অন্যান্য জেলায়ও একই চিত্র

একই অবস্থা তালিকার বাকি জেলাগুলোতেও, মাদারীপুর, সুনামগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল এবং গোপালগঞ্জ জেলা হাসপাতালেও আইসিইউ অবকাঠামো ও সরঞ্জাম থাকলেও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না রোগীরা।

জরুরি রেসপন্স ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্পের আওতায় ১০টি জেলায় কোটি কোটি টাকা খরচে আইসিইউর অবকাঠামো আর বাজেট ঠিকই বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু কোথাও ডাক্তারের অভাব, কোথাও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, আবার কোথাও তালাবদ্ধ আধুনিক যন্ত্রপাতি। সচেতন মহলের প্রশ্ন একটাই, প্রতিশ্রুতির এই আইসিইউগুলো কবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে?