মঙ্গলবার

৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২০ আশ্বিন, ১৪৩৩

হাজার কোটি টাকার বাজেট কি থামাতে পারছে স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:১৫

আপডেট: ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:১৯

শেয়ার

হাজার কোটি টাকার বাজেট কি থামাতে পারছে স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা?
ছবি বাংলা এডিশন

বাজেটের খাতায় হাজার কোটি টাকার রূপরেখা, কিন্তু হাসপাতালের দরজায় এলেই যেন ফুরিয়ে যায় তার সব কার্যকারিতা। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয় সরকারি হাসপাতাল। সাধারণের এই নির্ভরতাকে শক্তিশালী করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে দেয়া হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার বিশাল বাজেট, যা গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ।

দেশজুড়ে চরম অব্যবস্থাপনা

দেশজুড়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন দেখা দিয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে নেই চিকিৎসার সুস্থ পরিবেশ, শয্যা বা আসন সংখ্যাও একেবারেই সীমিত। মুমূর্ষু রোগীর জন্য নেই আইসিইউ সেবা কিংবা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্রটি হলো, একদিকে রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের গুদামে দিনের পর দিন ওষুধ স্টক করে রেখে মেয়াদ পার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে না দিয়ে সেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শেষে ফেলে দেয়া হচ্ছে ডাস্টবিনে।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

পিছিয়ে নেই খোদ রাজধানীও, মিরপুর এক নম্বরের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মিলেছে এমন ভয়ংকর অব্যবস্থাপনার প্রমাণ। প্রশ্ন হলো, জনগণের টাকায় কেনা ওষুধের এই অপচয় আর চরম অব্যবস্থাপনার দায় আসলে কে নেবে?

ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ

এবারের স্বাস্থ্যখাতের বিশাল বাজেটের পরও ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতির সমীকরণ একেবারেই সুবিধার নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ৬ জন, আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের।

এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬২ জনে, আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ৮৬ হাজার, এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮০ হাজার। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ২ হাজারেরও বেশি। আর অবাক করা বিষয় হলো, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল মাত্র ৫ জন। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) থেকে এই পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা আড়াইশো ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, চলতি বছর হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১২৫ জন। জুন মাসের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৪’শর বেশি শিশু ও রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

রোগীদের সীমাহীন ভোগান্তি

প্রতিবছর ডেঙ্গু ও হামে ঝরছে হাজারো প্রাণ। অথচ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ঢাকা, খুলনা থেকে বরিশাল পরিস্থিতি সর্বত্রই উদ্বেগজনক। একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও একটি সিট না পেয়ে, শেষমেশ হাসপাতালের করিডোর, সিঁড়ির নিচ বা বারান্দাতেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালগুলোতে গেলে চোখে পড়ে স্বজনদের সীমাহীন হতাশা আর আর্তনাদ। একটি সিটের জন্য ৬ থেকে ৭টি হাসপাতাল ঘুরেও মিলছে না ঠাঁই।

একই চিত্র হাম ও নিউমোনিয়া রোগীদের ক্ষেত্রেও। কারো শ্বাসকষ্ট, কারো বা টানা জ্বর আর শরীরে র‍্যাশ নিয়ে ৯ থেকে ১০ দিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে ধুঁকছেন। সিরিয়ালের পর সিরিয়াল, তবুও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসকের দেখা।

রোগীদের এই সীমাহীন ভোগান্তির কথা অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছে খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। স্থান সংকটের কারণে পরিত্যক্ত ও বিপজ্জনক ভবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে চিকিৎসা। পরিস্থিতি সামলাতে হাসপাতালের শয্যা উন্নীত করা জরুরি বলেও মনে করছে তারা। কিন্তু নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে, কোনো কোনো হাসপাতালের দায়িত্বরতদের।

কর্তৃপক্ষ সীমাবদ্ধতার কথা বলে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করছে, আর বছর ঘুরলেই বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বাজেট। কিন্তু, চিকিৎসা ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা আর অব্যবস্থাপনার যুপকাষ্ঠে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রশ্ন হলো, কাগজের এই বিশাল বাজেট সাধারণের জীবন বাঁচাতে, আর কতদিন এমন নীরব দর্শক হয়ে থাকবে?