মাথায় গ্র্যাজুয়েশন ক্যাপ, গায়ে নীল শার্ট, আর দু’হাত ছড়িয়ে শূন্যে ওড়ার এক ব্যাকুল চেষ্টা! বাবার বুকে জড়িয়ে থাকা আর মুখে বিশ্বজয়ের নিষ্পাপ হাসি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল মিষ্টি শিশু আভান। তার বয়স হয়েছিলো মাত্র সাড়ে চার বছর। পেশায় গণমাধ্যমকর্মী বাবা মৃদুল ইসলামের চোখের মণি ছিল এই অবুঝ সন্তান। কিন্তু সেই আলোকিত স্বপ্নগুলো ভুল চিকিৎসার বেড়াজালে ঢেকে গেছে আঁধারে।
ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর)। সামান্য জ্বর আর পেটে ব্যথা নিয়ে শিশু আভানকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অভিযোগ রয়েছে, ভর্তি করানোর পরই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরতরা তাকে ডেঙ্গু রোগী সন্দেহে চিকিৎসা দিতে শুরু করে।
পরিবারের দাবি, হাসপাতালে করা একের পর এক রক্ত পরীক্ষায় প্রতিবারই ডেঙ্গু রিপোর্ট এসেছিল 'নেগেটিভ'। ওই রিপোর্ট দেখার পরও, লাগাতার ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা দেয়া হয় শিশু আভানকে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর), কোনো স্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা না করেই শিশুটিকে হঠাৎ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। জানা গেছে, আইসিইউতে যাওয়ার সময় আভান সুস্থ ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, আইসিইউ-এর মতো সংবেদনশীল জায়গায় সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দূর থেকে স্রেফ টেলিফোনের নির্দেশনায় চলতে থাকে সাড়ে চার বছরের অবুঝ শিশুটির চিকিৎসা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটিকে দেয়া হয়েছিল অতিরিক্ত মাত্রায় 'ওভারডোজ' অ্যান্টিবায়োটিক, যার মারাত্মক প্রতিক্রিয়ায় সে আক্রান্ত হয় 'শক সিন্ড্রোম'-এ।
এছাড়াও, শিশুর স্বজনেরা বারবার আভানের চিকিৎসার রিপোর্ট দেখতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি তাকে অন্য কোনো হাসপাতালে স্থানান্তরেও নানা ভাবে বাধা দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে, শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটায় থমকে যায় আভানের স্পন্দন। অভিযোগ উঠেছে, সঠিক রোগ নির্ণয় না করে ভুল চিকিৎসা দেয়ার কারণেই অকালে মৃত্যু হয়েছে শিশুটির।
পরে স্বজনদের তীব্র চাপের মুখে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নথিপত্র দিলে, তাতে বেরিয়ে আসে রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিন্ড্রোমের করুণ সত্য। এছাড়া, শিশুটির শরীরের কাঁধে এবং হাতে অস্বাভাবিক দাগ লক্ষ্য করা গেছে। যা ভুল চিকিৎসার সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এই অবস্থায়, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে, দিশেহারা বাবা-মায়ের চোখের পানি যেন থামছিলোই না।
যে গণমাধ্যমকর্মী বাবা এতদিন অন্যের বিচার পাওয়ার খবর প্রকাশ করেছেন, তিনি আজ নিজের সন্তানকে অবহেলায় হত্যার বিচারে দাঁড়িয়েছেন শূন্য হাতে। ইতোমধ্যেই, গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে শিশুটির দাফন দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এসময়ও, শিশুটির পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানায়।
একই দিনে আরেক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ
অন্যদিকে, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। একই দিনে আভান ছাড়াও চিকিৎসা অবহেলায় মাহদিয়া জাবরিন নামের আরও এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছে স্বজনরা।
শিশু আভানের হৃদয় বিদারক ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন, সুস্থ অবস্থায় নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতালে ঢোকা শিশুটি ভুল চিকিৎসায় লাশ হয়ে ফিরলো। এ যেন দেশের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক করুণ ও ভয়াবহ চিত্র।
তবে চিকিৎসা অবহেলায় দুই শিশুর মৃত্যুর দায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, মৃত্যুঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।
চিকিৎসা সেবায় চরম গাফিলতি ও অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে, দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
আরও পড়ুন:







