শুক্রবার

২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় সাড়ে ৭ হাজার রোগী, সিরিয়াল ২০২৮ সালে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২৯

শেয়ার

রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় সাড়ে ৭ হাজার রোগী, সিরিয়াল ২০২৮ সালে
ছবি সংগৃহীত

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিআরএইচ) রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালের ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের চারটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে অচল। বর্তমানে দুটি মেশিনে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ সামলাতে গত এক মাস ধরে নতুন রোগীদের রেডিওথেরাপির সিরিয়াল নেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অপেক্ষমাণ অনেক রোগীর সিরিয়াল পড়েছে ২০২৮ সালের শেষভাগে।

নেত্রকোনার আসমা বেগমের চলতি বছরের এপ্রিলে ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত হয়। জরুরি ভিত্তিতে তার সার্জারি করা হয়। এরপর জেলা সদরে কেমোথেরাপি নেন তিনি। এখন তার রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচের কথা বিবেচনা করে তিনি মহাখালীর এনআইসিআরএইচে আসেন। টানা তিন দিন ঘুরেও রেডিওথেরাপির জন্য নিজের নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, নতুন রোগীদের সিরিয়াল নেয়া বন্ধ রয়েছে।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ক্যান্সারের সার্জারির পর সাধারণত দুই মাসের মধ্যে রেডিওথেরাপি শুরু করা প্রয়োজন। এর বেশি দেরি হলে থেরাপির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি রোগীর জীবনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

দুটি মেশিনে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন আড়াইশ রোগী

হাসপাতালে বর্তমানে দুটি রেডিওথেরাপি মেশিনে পুরনো ও অপেক্ষমাণ রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তিন শিফটে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেশিন দুটি তাদের সক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগীকে সেবা দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন পরের সিরিয়াল পাওয়া রোগীদের মধ্যে চিকিৎসা শুরুর আগ পর্যন্ত ক্যান্সারের পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেরির কারণে শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া কিংবা রোগটি আবার ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এনআইসিআরএইচের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন জানান, নতুন রোগীদের সিরিয়াল দিয়েও তেমন লাভ হচ্ছে না। কারণ নতুন করে সিরিয়াল দেয়া হলে রোগীদের প্রায় দুই বছর পর থেরাপি নিতে হবে। এতদিন অপেক্ষা করলে তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে সাত হাজারের বেশি রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন এবং গত এক মাস ধরে নতুন রোগীর সিরিয়াল নেয়া বন্ধ রয়েছে।

একটি মেশিন কিনতে প্রয়োজন ৩২ থেকে ৩৫ কোটি টাকা

হাসপাতালে ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিন পরিচালনার ব্যবস্থা থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় নতুন মেশিন কেনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এনআইসিআরএইচের পরিচালক। একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা ও স্থাপনে ৩২ থেকে ৩৫ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা হয়েছে। সেটি আগামী জানুয়ারির মধ্যে দেশে আসবে। এ ছাড়া আরও একটি মেশিন কেনার জন্য নতুন দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একজন রোগীর রেডিওথেরাপির কোর্স শেষ করতে সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে। এতদিন নতুন রোগীদের থেরাপির জন্য সিরিয়াল দেয়া হলেও রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে নতুন রোগীদের সিরিয়াল নেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

সরকারি হাসপাতালে নির্ভরতা বেশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের

ক্যান্সারের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক পরিবারের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য হাসপাতালটি ক্যান্সারের চিকিৎসায় বড় ভরসার জায়গা।

তাদের মতে, রোগীর তুলনায় রেডিওথেরাপি মেশিন এমনিতেই অপর্যাপ্ত। এর মধ্যে চারটি মেশিন বছরের পর বছর অচল থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারে আক্রান্ত অর্ধেকের বেশি রোগীর চিকিৎসার কোনো না কোনো পর্যায়ে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। রেডিওথেরাপির সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।

আরও বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরির প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগে মফস্বল শহরেও এ ধরনের হাসপাতাল গড়ে তোলার পাশাপাশি রাজধানীকেন্দ্রিক ক্যান্সার চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।

তাদের মতে, ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে শুধু রেডিওথেরাপি মেশিন কেনাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও রেডিয়েশন থেরাপিস্টও প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, ক্যান্সার রোগীদের এ ধরনের ভোগান্তি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। দেশে বিপুলসংখ্যক ক্যান্সার রোগী রয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে রেডিওথেরাপি দেয়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে চিকিৎসাসেবা দেয়া যেতে পারে। এতে সরকারি ক্যান্সার হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হলেও ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে আনুমানিক ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ এবং নারী ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন। আক্রান্তদের কেউ দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে এবং কেউ দেশের বাইরে চিকিৎসা নেন। তাদের একটি বড় অংশ জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, একক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হওয়া এবং অন্যান্য হাসপাতাল থেকে রোগীর বাড়তি চাপের কারণে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।

তিনি জানান, সরকার বিশেষ উদ্যোগে আটটি বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কেন্দ্রে ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের বিশেষায়িত সেবা দেয়া হবে। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এরই মধ্যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। সেখানে জনবল ও যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এসব বিভাগীয় কেন্দ্র চালু হলে ক্যান্সার হাসপাতালসহ অন্যান্য বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ ধীরে ধীরে কমবে।