মঙ্গলবার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

আওয়ামী দোসরখ্যাত পরিচালক নাসিরের রাজত্ব বার্ন ইনস্টিটিউটে!

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:২০

শেয়ার

আওয়ামী দোসরখ্যাত পরিচালক নাসিরের
রাজত্ব বার্ন ইনস্টিটিউটে!
ছবি সংগৃহীত

ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও, স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষ পদগুলোতে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগীরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খোলস পাল্টে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত এমন অনেকের বিরুদ্ধে এখন বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

এমনই এক আলোচিত নাম, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে নজিরবিহীন দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করার।

বিগত শাসনামলে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে উপস্থিতি

বিগত শাসনামলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি ছিল এই চিকিৎসকের। প্রভাবশালী নেতা-নেত্রীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সখ্যতার প্রমাণও মিলেছে। অথচ, ২৪ এর ৫ আগস্টের পর রাতারাতি রাজনৈতিক ভোল পাল্টে ফেলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিনিময়ে বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন ডা. নাসির। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করেছে প্রভাবশালী একটি চক্র, যাদের মধ্যে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ’র সাবেক রুমমেট রিজভী, সাবেক সমন্বয়ক ইয়ামিন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী প্রফেসর ডা. সাইদুল ইসলামের এপিএস, সাইফুদ্দিন শাকিলের নামও আলোচনায় এসেছে।

পেট্রোল বোমা হামলা ও জ্বালাও পোড়ানোর অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সামন্ত লাল সেনের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে অতীতে নিরীহ মানুষের ওপর পেট্রোল বোমা হামলা ও যানবাহন ভাঙচুরের মতো ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন ডক্টর নাসির। ২০১৩-১৪ সালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, জ্বালাও পোড়ানোর নামে হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেসময়ে, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ফাঁসাতে, হাসিনার সহযোগী হিসেবে, কাজ করেছে নাসির, সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায় এমনটাও।

সেইসাথে, অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিমের সাথে সখ্যতা কাজে লাগিয়ে, বার্ন ইউনিটের টেন্ডার ও কোটি টাকার কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করতেন নাসির।

এএমজেড হাসপাতাল ও রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

এছাড়া, রাজধানীর বাড্ডায় গড়ে তোলা ‘এএমজেড হাসপাতাল’-এর পেছনে সরকারি অর্থ ও সরঞ্জাম ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দামি চিকিৎসাসামগ্রী পাচার এবং রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের।

এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে বার্ন ইউনিটের ভেতরে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সাথে গোপন বৈঠক এবং ছাদ থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও ক্যাডারদের গুলি চালানোর নির্দেশদাতা হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে।

জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে, জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ ছাত্র-জনতা যখন হাসপাতালে ছুটে আসেন, তখন তাদের চিকিৎসায় চরম অবহেলা করা হয়। অথচ, ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে গেলে, তিনি সমন্বয়কদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি প্রচার করতে শুরু করেন।

গুঞ্জন রয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদ পেতে একশো কোটি টাকার তহবিল প্রস্তুত রেখেছেন ডা. নাসির। এদিকে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বার্ন ইনস্টিউটে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ করেছেন খোদ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে চাকরিচ্যুতির হুমকি।

স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, নাসির পরিচালকের চেয়ারে বসার পর থেকেই বার্ন ইনস্টিটিউটে শুরু হয় চরম স্বেচ্ছাচারিতা। টেন্ডার ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য সাবেক এক যুবলীগ নেতাকে নিজের অলিখিত একান্ত সচিব বানিয়েছেন তিনি। এছাড়া নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নিজের খেয়ালখুশিমতো জনবল নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটাতেও উঠেছে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ। প্রয়োজনীয় গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারির বাইরে অতিরিক্ত পরিমাণে কেনা হয়েছে ‘আরবোটামাইন’ নামের একটি অপ্রয়োজনীয় ওষুধ।

জানা যায়, মালামাল ও ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে বাজারদরের কোনো তোয়াক্কা করা হতো না। দরপত্র কিংবা অফিশিয়াল প্রক্রিয়ার বাইরে নিজের ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হতো, যা আগে থেকেই বাইরে থেকে ঠিক করে নিয়ে আসা হতো।

আর মাত্র ৩০ থেকে ৬৫ লক্ষ টাকা বাজারমূল্যের আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন কেনা হয়েছে ১ কোটি ৪২ লক্ষ টাকায়। রিসিভ কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘তাজ ট্রেডার্স’-কে শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে, অথচ হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডগুলো ভুগছে চরম সংকটে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই এই স্বৈরচারের দোসরখ্যাত ও বিতর্কিত চিকিৎসকের অপসারণের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন করে আসছে ছাত্র-জনতা। তবুও তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন।

জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত হওয়ার অপচেষ্টা

এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত হতে, ডা. জোবায়দা রহমানকে প্রধান অতিথি করে একটি অনুষ্ঠানের করেছেন ডক্টর নাসির। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের এমন একজন চিহ্নিত সুবিধাভোগীর জিয়া পরিবারের এত কাছাকাছি পৌঁছানোর অপচেষ্টা, নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।

বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করছে সচেতন মহল। সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই নাসিরকে নিয়ে একটাই দাবি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত এই চিকিৎসককে অপসারণ করে দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেকোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ জানান, অনিয়মে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না, নিয়ম ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অবগতির আওতায় আনা হয়েছে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক তদারকি অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. এ. বি. মোঃ শামছুজ্জামান।

বার্ন ইনস্টিটিউটে শেকড় গাড়া দুর্নীতি আর অপশাসনের এই সিন্ডিকেট কি ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে, নাকি বহাল তবিয়তেই থেকে যাবে স্বৈরাচারের দোসররা? জুলাই আন্দোলনের রক্তে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই লড়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।