বৃহস্পতিবার

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২ আশ্বিন, ১৪৩৩

ভারত থেকে 'এমবিবিএস ডিগ্রি' ভুয়া সনদে চিকিৎসকের কারসাজি

সাগর মন্ডল বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:০৪

শেয়ার

ভারত থেকে 'এমবিবিএস ডিগ্রি' ভুয়া সনদে চিকিৎসকের কারসাজি
ছবি বাংলা এডিশন

গত ১২ মে বাংলা এডিশনে প্রকাশিত ভুয়া ডাক্তারের রমরমা বাণিজ্য শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র ধরে, এবার ভারতের কলকাতাতে অনুসন্ধানে যায় টিম বাংলা এডিশন। অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসানের সনদে উল্লিখিত ভারতের বারাসাতের দি ওপেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফর কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনস-এর সন্ধানে গিয়ে মেলে অবিশ্বাস্য তথ্য।

কলকাতায় অনুসন্ধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নেই

সেখানে, কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অস্তিত্বই নেই। আবার সেই ঠিকানায়, পাওয়া যায় কেবল কয়েকটি চায়ের দোকান। আর স্থানীয়রাও নিশ্চিত করেন, এই এলাকায় এ ধরনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো ছিল না।

বিএমডিসি-র বৈধ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বাগেরহাটের শরণখোলায় চিকিৎসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন মাহমুদুল হাসান। বিষয়টি নিয়ে এর আগে তিনি জানান, ভারতের বারাসাতের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি চিকিৎসার ওপর এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে, তার দেয়া ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি সেখানে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও হয়রানি

অথচ এই প্রতারণা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায়, উল্টো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, মিথ্যা মামলা ও মানববন্ধনের মতো অভিযোগ উঠেছে ভুয়া ডাক্তারের সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়। এ ঘটনায় বাংলা এডিশনের বাগেরহাট প্রতিনিধি সাগর মণ্ডলের ভাই সৈকত মণ্ডল আদালতে মামলা করলে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। এরপরই সংবাদকর্মীদের হেয় করতে ভুয়া ডাক্তারের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালায় কতিপয় সাংবাদিক ও প্রভাবশালী চক্র।

এমনকি সাংবাদিকদের স্ত্রীদের নাম জড়িয়ে ভিত্তিহীন মামলা দেয়া এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত করতে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিকদের দাবি, ভুয়া ডিগ্রি ও অবৈধ চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই ছিল মূল বিষয়; যার কারণে এই হয়রানি। যা স্বাধীন সংবাদ পরিবেশকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে।

অপচিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার স্বীকারোক্তি

অন্যদিকে, একপর্যায়ে কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত ডিগ্রির ওপর ভর করে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কথা মাহমুদুল নিজেই স্বীকার করেছেন বাংলা এডিশনের কাছে। ইতিপূর্বে সিভিল সার্জন তার কার্যক্রম বন্ধের চিঠি দিলেও, এক অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে তিনি আবারও অবৈধভাবে রোগী দেখা শুরু করেন।

কলকাতার স্থানীয়দের মতে, ভারতের ভুয়া সনদ ব্যবহার করে বাংলাদেশে অপচিকিৎসা চালানো একটি গুরুতর অপরাধ।

বারাসাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকায় এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ভুয়া ডাক্তার মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

আগের অনুসন্ধান ও দুদকের অভিযান

বাংলা এডিশনের আগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, শরণখোলার গ্রামীণ জেনারেল হাসপাতালে এমবিবিএস ও বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখছিলেন মাহমুদুল হাসান। ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তার চেম্বার এবং প্র্যাকটিস বন্ধের নির্দেশ দেয়। এছাড়া, অতীতে ভুয়া চিকিৎসা দেয়ার মামলায় তিনি ১৯ দিন কারাবাসও করেন। এমনকি দুদকের অভিযানে তার সনদের অনিয়মের প্রমাণ মেলে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন না থাকার কথা মাহমুদুল নিজেই স্বীকার করেন। এছাড়া স্থানীয় এক কথিত সাংবাদিককে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা মাসোহারা দিয়ে তিনি প্রচার চালিয়ে আসছিলেন। তার এই অপচিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার বদলে বহু রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল।

বারাসাতের ঠিকানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে চায়ের দোকান মেলার ঘটনায় তার ডিগ্রির বৈধতা নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও মাহমুদুলকে নিষিদ্ধ না করায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে স্থানীয়রা।