বৃহস্পতিবার

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২ আশ্বিন, ১৪৩৩

অপচিকিৎসায় মৃত্যু তালিকা লম্বা হচ্ছে দিনের পর দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৫

শেয়ার

অপচিকিৎসায় মৃত্যু তালিকা লম্বা হচ্ছে দিনের পর দিন
ছবি সংগৃহীত

হাসপাতাল মানেই মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়স্থল। যেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসার প্রত্যাশায় স্বজনরা তুলে দেন প্রিয়জনকে চিকিৎসকের হাতে। কিন্তু, সেই হাসপাতালেই যখন চিকিৎসাধীন একটি শিশুকে কয়েক ঘণ্টা আগেও সুস্থ বলে জানান চিকিৎসক, আর তার পরপরই হঠাৎ লাইফ সাপোর্টে নেয়ার পরই শিশুটির মৃত্যু হয়, তখন প্রশ্ন শুধু চিকিৎসককে ঘিরেই নয়—আঙুল ওঠে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসাসেবার দিকেও।

সম্প্রতি, ঢাকার পদ্মা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে নয় মাস বয়সী শিশু আয়ান আব্দুল্লাহর মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে এমনই এক উদ্বেগজনক প্রশ্ন।

আয়ানের মৃত্যু ও পরিবারের অভিযোগ

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে হাসপাতালটির এনআইসিইউতে শিশু আয়ান মারা গেলে আসিফ নামের শিশুটির এক নিকটাত্মীয় ফেসবুক লাইভে এসে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। এ সময় চিকিৎসকের অবহেলার কারণে শিশু আয়ানের মৃত্যু হয়েছে—এমন অভিযোগকে সামনে রেখে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলতে দেখা যায় আসিফকে।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক তোলপাড়। দেশের প্রায় প্রতিটি মহলেই এ নিয়ে জন্ম নেয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। সেই সঙ্গে নেটিজেনদেরও আসিফের ভিডিও শেয়ার করে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

এদিকে, চিকিৎসকের অবহেলা ও হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণেই শিশু আয়ানের মৃত্যু হয়েছে—এমন অভিযোগ করে শিশুটির পরিবারের অন্য সদস্যরাও।

এছাড়া, শিশু আয়ানের পরিবার জানায় সম্পূর্ণ এক করুণ বাস্তবতার কথা। তাদের অভিযোগ, আয়ানকে পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর থেকেই হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষ—সবার কাছ থেকেই পাওয়া যায় অসৌজন্যমূলক আচরণ।

সেইসাথে তাদের দাবি, শিশু আয়ানের মৃত্যুর দিন বিকেলেও আয়ান সুস্থ আছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আয়ানের বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে জানানো হয়, তাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হবে।

সে সময় আয়ানকে তার মা-বাবা দেখতে চাইলেও দেখতে দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করে ভুক্তভোগী পরিবার।

পরবর্তীতে আয়ানের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এসে এনআইসিইউতে ঢুকে আয়ানকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।

এ সময় দায়িত্বরত চিকিৎসককে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জবাব

এদিকে, হাসপাতালের পরিচালক ড. আতিকুল ইসলাম আসিফকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আখ্যা দিলেও বাস্তবে খোঁজ নিয়ে পাওয়া যায় তার বিপরীত চিত্র। আসিফের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি বিশ্লেষণ করে কোনো ধরনের কনটেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অপরদিকে, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের ক্ষোভের মুখে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, শিশু আয়ানের মৃত্যুর সময়ও হাসপাতালে দুজন চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন। এবং সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন এই পরিচালক।

এছাড়াও বিষয়টিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফেসবুক লাইভে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে, পাল্টা অভিযোগ তোলেন পরিচালক। তার দাবি, লাইভে আসা ব্যক্তি শিশুটির কোনো আত্মীয় নন। এমনকি আসিফকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বলেও আখ্যা দেন কর্তৃপক্ষ।

তবে, বাংলা এডিশনের হাতে আসা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে আসিফ ওই পরিবারের অনেক আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ। সম্পর্কে তিনি আয়ানের নানা হন।
আপস। এখানে নির্দিষ্ট ছবি যাবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আয়ানের পরিবারের সদস্যরাও। তারা জানায়, সেদিন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নয়, আয়ানের আত্মীয়তার টানেই হাসপাতালে যান আসিফ।

এদিকে, আসিফের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার দাবি, তিনিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা হাসপাতালে চিকিৎসকের খোঁজ করলে বাইরে থেকে কিছু অপরিচিত সন্ত্রাসী এসে তাদের হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে।

বিল মওকুফ ও হাসপাতালের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন

এই অবস্থায়, শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে হাসপাতালের অ্যাকাউন্টসে জমা ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার বিল বাবদ ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা মওকুফ করে দেয়া হয়েছে বলেও দাবি করে কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু, হাসপাতালের সার্বিক বিল মওকুফের বিষয়েও পরিবারের দাবি ভিন্ন। তাদের জানায়, সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করেই আয়ানকে হাসপাতাল থেকে বের করা হয়েছে।

সেইসঙ্গে হাসপাতালের দেয়া বিলের ভাউচারেও উঠে আসে আয়ানের পরিবারের কথার সত্যতা। সেখানে, স্পষ্ট দেখা যায়, কোনো বিল মওকুফ করা হয়নি।

এরই মাঝে, পদ্মা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডের অস্তিত্ব নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। সবার ধারণা, শিশু আয়ানের মৃত্যু পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সরেজমিনে টিম বাংলা এডিশন উপস্থিত হয়ে একাধিক সূত্রে জানতে পারে, শিশুটির মৃত্যু পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে নয়, বরং পদ্মা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডের এনআইসিইউ বা পিআইসিইউতে ঘটেছে। যা দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান এবং ভিন্ন মালিকানাধীন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে জানতে চাইলে, তিনি সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। তবে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

চিকিৎসার নামে এই বাণিজ্য এবং বাণিজ্যের কারণে একটি অবুঝ শিশুর মৃত্যু আরো একবার প্রশ্ন তুলেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে। জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিবেচনায়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে, দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপের আহ্বান সবার।