বৃহস্পতিবার

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৬ ভাদ্র, ১৪৩৩

হামে পাঁচ মাসে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:৩৪

শেয়ার

হামে পাঁচ মাসে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু
ছবি বাংলা এডিশন

শিশুর হাসির ঘরে আজ মৃত্যুর ছায়া। আর সেই মৃত্যুর আদলেই গড়ে উঠেছে এক দীর্ঘ প্রাণঘাতী মিছিল। সাড়ে পাঁচ মাস ধরে চলছে সেই মিছিলের অন্তহীন পদযাত্রা। প্রথমে লাল দাগ। তারপর জ্বর। সেই সঙ্গে নিস্তেজ হয়ে পড়া ছোট্ট শরীর। একসময় সেই শরীরই নিথর হয়ে থেমে যাচ্ছে চিরতরে।

প্রায় এক হাজার মৃত্যু ও লাখো আক্রান্ত

এরই মধ্যে সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৯৯৯ জনের। ১৭৮ দিনের এই হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ সময়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে হাম আক্রান্তের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার।

টিকাদান কর্মসূচি ও হার্ড ইমিউনিটির লক্ষ্য

তথ্য বলছে, হাম ছড়িয়ে পড়ার পর জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছিল সরকার। লক্ষ্য ছিল—শিশুদের বড় একটি অংশকে দ্রুত টিকার আওতায় এনে তৈরি করা হবে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ বলয়, অর্থাৎ ‘হার্ড ইমিউনিটি’। কিন্তু পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতা বলছে—হাম এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

টিকা দেয়ার পরও যদি সংক্রমণের গতি থামানো না যায়, যদি হাসপাতালের শয্যা ভরে যায় আক্রান্ত শিশুতে, আর যদি মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন যোগ হতে থাকে নতুন নতুন নাম—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, কোথায় ব্যর্থ হলো সেই প্রতিরোধের বলয়?

হাম প্রতিরোধে এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল—কয়েক মাসের মধ্যেই তৈরি হবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ এবং তাতে স্বাভাবিক হবে হামের পরিস্থিতি।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য যে পরিমাণ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি সরকার। ফলে টিকাদান কর্মসূচি চললেও ভাইরাসের দাপট থামেনি।

টিকাদানের পরিসংখ্যান ও সংশয়

টিকাদানের পরিসংখ্যানেও উঠছে নানা সংশয়। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করছে—এপ্রিল ও মে মাসের কর্মসূচিতে টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু। সরকারের দাবি, শতভাগ টিকা পৌঁছেছে দেশের প্রতিটি কোনায়।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান সরকারের এত সতর্কতা, এত উদ্যোগ আর প্রতিরোধের নানা আয়োজন সত্ত্বেও, কীভাবে বাড়ল হামের প্রকোপ?

সরকারের দাবি, সঠিক সময়ে টিকা না পাওয়ার কারণেই হামের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ। যার কারণে হামের তাণ্ডব রূপ নিয়েছে মৃত্যুর মিছিলে। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও উঠে আসে এই বিষয়টি।

হাসপাতালে বাড়ছে চাপ

এরই মধ্যে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে হামে আক্রান্ত রোগীদের চাপ। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে রোগীর চাপ সামলাতে শয্যা সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

এপ্রিলের টিকাদান কর্মসূচির পর জুন-জুলাইয়ে কিছুটা কমেছিল আক্রান্তের সংখ্যা। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও সংক্রমণ বেড়েছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ, টিকার পর সাময়িক স্বস্তি এলেও সেই স্বস্তি যেন ছিল ঝড়ের আগে নেমে আসা সাময়িক নীরবতা। আবারও বাড়ছে সংক্রমণ, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ—আর তার সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগও।

সরকারের অবস্থান ও বিশ্লেষকদের মত

এদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবহেলার কারণেই হামের সংক্রমণ দেশে পঙ্গপালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি বর্তমান সরকারের। স্বাস্থ্য মন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইউনুস সরকারকে ইউনিসেফ এ ব্যাপারে সতর্ক করলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা।

এখন তাদের টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা জোরদারের চেষ্টা চলছে বলে জানান সাখাওয়াত হোসেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকার সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপার সুযোগ নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো—লক্ষ্যভুক্ত প্রতিটি শিশুর কাছে সঠিক সময়ে টিকা পৌঁছেছে কি না, বাদপড়া শিশুদের শনাক্ত করা হয়েছে কি না সেটাই নজরদারিতে রাখা। সেইসাথে, স্বাস্থ্যখাতের বিশাল বাজেটও, হামের উপদ্রব কমিয়ে আনতে কাজে লাগানো জরুরি বলে মত বিশ্লেষকদের।