একটি নতুন প্রাণের আগমন ঘিরে পরিবারে ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, সেই আনন্দ রূপ নিলো নিস্তব্ধ আর এক বুক হাহাকারে। ভুল চিকিৎসা নাকি মারাত্মক অবহেলা? কোন বলিখেলায় ঝরে গেল একটি তাজা প্রাণ আর এক নিষ্পাপ নবজাতকের জীবন?
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ
গাজীপুরের টঙ্গী স্টেশন রোডের নিউ লাইফ হাসপাতাল অ্যান্ড ট্রমা সেন্টার। বুধবার (২৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় সন্তান প্রসবের জন্য এখানে ভর্তি করানো হয় পূবাইলের রবিউল ইসলাম তুহিনের স্ত্রী, ১৯ বছর বয়সী তামান্নাকে। দায়িত্বে ছিলেন গাইনি বিভাগের ডা. ফারহানা আক্তার এবং অ্যানেস্থেসিয়ার ড. বেলায়েত হোসেন।
পরিবারের অভিযোগ, সুস্থ মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর সিজারিয়ান অপারেশনের সময়, অবহেলা করা হয়। প্রসূতি যন্ত্রণায় ছটফট করলেও, স্বজনদের কিছু না জানিয়ে ঘটনা গোপন রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অবস্থা বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে, রাত ১০টায় মুমূর্ষু তামান্নাকে অ্যাম্বুলেন্সে পাঠানো হয় উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে। কিন্তু, ততক্ষণে সব শেষ। সেখানকার চিকিৎসকরা জানায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর বহু আগেই মৃত্যু হয়েছে তামান্নার। আর, সেখানেই তামান্নার গর্ভে মৃত্যুবরণ করেন নবজাতক শিশু।
সাড়ে তিন লাখ টাকায় মিটমাট
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর সত্য। মাত্র ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায়, দুটি তাজা প্রাণের অপমৃত্যুর মূল্য নির্ধারণ করে আইনি ঝামেলা এড়িয়ে, সটকে পড়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।
পরিবারের এসব অভিযোগ কি কেবলই আবেগের বহিঃপ্রকাশ, নাকি নেপথ্যে রয়েছে চরম গাফিলতি?
সত্য অনুসন্ধানে গাজীপুরের ওই হাসপাতালে পৌঁছায় টিম বাংলা এডিশন। ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আর বাংলা এডিশনের ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে রাজি হয়নি হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
দীর্ঘক্ষণ পর দেখা মেলে দীর্ঘ ৭ বছর ধরে সেখানে কাজ করা এক কর্মচারীর। শুরুতে মুখ না খুললেও, একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে সেদিনের সেই ভয়াবহ সত্য।
হাসপাতালের এই কর্মচারী স্বীকার করেন, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় হঠাৎ করেই রোগীর মারাত্মক খিচুনি শুরু হয় এবং ওটিতেই মৃত বাচ্চা প্রসব হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তড়িঘড়ি করে, উত্তরার আইসিইউতে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও, পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন প্রসূতি তামান্না।
তার বক্তব্য আর নিউ লাইফ কর্তৃপক্ষের দাবি যাচাই করতে, টিম বাংলা এডিশন সরাসরি চলে যায় উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে। সেখানে উন্মোচিত হয় আরও ভয়াবহ তথ্য।
চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, নবজাতক ও মা কাউকেই জীবিত আনা হয়নি। শিন শিন জাপান হাসপাতালে পৌঁছানোর বহু আগেই মৃত্যু হয় তাদের।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ চিত্র
চিকিৎসা নীতির তোয়াক্কা না করে কীভাবে চলছে এই হাসপাতাল? ভেতরের চিত্র দেখে যে কেউ আঁতকে উঠবেন। নেই কোনো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নেই কোনো প্রসূতি বিভাগের বিশেষায়িত নির্দিষ্ট কক্ষ। সাধারণ, ডেলিভারিও করানো হয় অপারেশন থিয়েটারে। আর ওটির দিকে যেতে, মনে হবে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হচ্ছেন কেউ। যার পাশে অরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে বিশালাকার গ্যাস সিলিন্ডার।
নূন্যতম নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাহীন এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৭টি জটিল অপারেশন পরিচালনা করা হয় বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হাসপাতাল পরিচালনার বৈধ লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে আরও ২ বছর আগেই।
প্রতিবাদ ও সমঝোতা
মা ও শিশুর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ স্বজনরা হাসপাতালের সামনে মরদেহ নিয়ে প্রতিবাদ জানালে, তড়িঘড়ি করে খবর দেয়া হয় আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে। এরপরই নেপথ্যে শুরু হয় ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার দেনদরবার।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে টঙ্গী পশ্চিম থানার এস আই ফরিদুল জানান, উভয় পক্ষের সমঝোতা এবং লিখিত অভিযোগ না থাকার কারণে, কোনো আইনি ব্যবস্থা ছাড়াই মরদেহ দুটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জানা যায়, এর আগেও গত বছর ঠিক একইভাবে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল এই হাসপাতালে। কিন্তু, অদৃশ্য কোনো শক্তির বলে প্রতিবারই পার পেয়ে গেছে এই মৃত্যুকূপ।
তদন্ত কমিটি গঠন
টাকার বিনিময়ে অপমৃত্যু ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তা ড. মোঃ মামুনুর রহমান জানান, অনিয়ম ও অনিবন্ধনের অভিযোগ খতিয়ে দেখে, কার্যকরি আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালটির সকল কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
সাধারণ মানুষের জীবনের বিনিময়ে ক্লিনিক ব্যবসার নামে, এমন বেপরোয়া বাণিজ্য আর কতদিন চলবে? সেই প্রশ্নই এখন সচেতন মহলের।
আরও পড়ুন:







