রবিবার

২৩ আগস্ট, ২০২৬ ৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

স্বাস্থ্যখাতে বাজেট যতো বড় চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন ততো বেশি

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:০৫

শেয়ার

স্বাস্থ্যখাতে বাজেট যতো বড় চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন ততো বেশি
ছবি বাংলা এডিশন

প্রতিটি দেশের নাগরিকদের জন্য চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক স্তম্ভ। কিন্তু বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলে, সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই কর্তাব্যক্তিদের কাছে।

বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা যখন লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য, তখন মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে সরকারি হাসপাতাল। সাধারণ মানুষের এই নির্ভরতাকে শক্তিশালী করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকার বিশাল বাজেট যা গত অর্থ বছরের ৩৫,৪৭৭ কোটি টাকার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। তবে বাজেটের পাতায় এই বিশাল অংকের রূপরেখা থাকলেও, হাসপাতালের দরজায় এসে যেন ফুরিয়ে যায় বাজেটের কার্যকারিতা।

বরাদ্দের বড় অংশ চলে যায় কেনাকাটায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাদ্দের বড় অংশই চলে যায় কেনাকাটার হরিলুটে; যার দরুন তৃণমূল থেকে জেলা ও উপজেলা স্তরের হাসপাতালগুলোতে নেই পর্যাপ্ত বেড, ওষুধ কিংবা মুমূর্ষু রোগীর আইসিইউ ও লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা।

চলতি বছরে দেশজুড়ে সঠিক সময়ে টিকার অভাবে হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে, অকালে প্রাণ গেছে প্রায় ১ হাজার নিষ্পাপ শিশুর। অনেক অভিভাবক ও সাধারণ নাগরিক জানায়, তাদের শিশুরা নিয়মিত টিকা নেয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে হামে আক্রান্ত হয়েছে।

ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে যে, অতীতে সরবরাহকৃত টিকার মান, কোল্ড চেইন রক্ষা কিংবা স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো ঘাটতি ছিল কি না।

বিশেষায়িত হাসপাতালেও চরম দুর্ভোগ

রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতেও পৌঁছাতে সাধারণ মানুষকে পাড়ি দিতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগের পথ। আগারগাঁওয়ের ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে প্রতিদিন সারা দেশ থেকে ভিড় করে মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের হাজারো জটিল রোগী।

কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে অনেকেই।

তবে, হাসপাতালটিকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে পরিচালক চাপ কমার আশা ব্যক্ত করেন।

অন্যদিকে, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভোরের আলো ফোটার আগেই টিকিট পাওয়ার লড়াই শুরু হয়। ভোরে গেট খোলার সাথে সাথে নারী-পুরুষ-প্রবীণ নির্বিশেষে টিকিট কাউন্টারের দিকে দৌড়াতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কিতে আছড়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চোখের জটিল চিকিৎসার আকুলতা থেকেই রোগীরা এই চরম ঝুঁকি নিচ্ছে।

লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পাচ্ছে না। টিকিট, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তাদের।

প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন ১,০০০ থেকে ১,২০০ রোগীকে সেবা দেয়ার জন্য গঠিত হলেও বর্তমানে বহির্বিভাগে দৈনিক ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ রোগী আসছে। ৩-৪ গুণ বেশি রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং প্রতিদিন গড়ে শতাধিক অস্ত্রোপচার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালের দায়িত্বরতরা।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের স্তূপ

এদিকে, মিরপুর-১ লালকুঠি বাজারের মাজার রোডে অবস্থিত মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে যখন প্রয়োজনীয় ওষুধ সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে, তখন সরকারি হাসপাতালের আন্ডারগ্রাউন্ডে পড়ে আছে বস্তার পর বস্তা ওষুধ।

গোপন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মিরপুর এক নম্বরের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধানে নামে ‘টিম বাংলা এডিশন’। হাসপাতালে প্রবেশের পর আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা আনসার সদস্যরা গোপন কক্ষের কথা সরাসরি অস্বীকার করে একে কেবল ময়লা-আবর্জনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

তবে অনুসন্ধানী দল কক্ষটিতে প্রবেশ করতেই উন্মোচিত হয় অন্ধকার সত্য, মেঝেতে পড়ে থাকা শত শত বস্তা সরকারি ক্যালসিয়াম, ভিটামিন, প্যারাসিটামল ও মেট্রোনিডাজল, যা সাধারণ মানুষ না পেয়ে মেয়াদ হারিয়ে পরিণত হয়েছে বর্জ্যে।

করিডোরে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে ৫০১ নম্বর কক্ষে স্যারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেয়া হয়।

স্টোরকিপারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্টোর পরিদর্শনে অস্বীকৃতি জানান এবং দাবি করেন, কোনো স্টোরই তার সরাসরি দায়িত্বে নেই।

এনিয়ে, হাসপালের পরিচালক ডক্টর ইকবাল কবিরের দাবি, এসব ওষুধ তার দায়িত্বকালীন সময়ের নয়। অতীতে এখানে ৫ শয্যার যে আইসিইউ চালু ছিল, সেখানকার কনসালটেন্ট ও প্রফেসরদের ফেলে যাওয়া পিপিই ও ওষুধ নিবন্ধিত অবস্থায় রয়ে গেছে, যার মাত্র ৩০ শতাংশ ওষুধ পরবর্তীতে মেয়াদ হারায়।

অনিয়মের পাশাপাশি সরেজমিনে দেখা গেছে হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। পরিচালক ঢাকা মেডিকেলের চেয়েও পরিষ্কার-পরিবেশের দাবি করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এছাড়া বিকল লিফট, স্বজনদের থাকার জায়গা না থাকায় রাতে রাস্তা থেকে বের করে দেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

নাটোরে নারকীয় নির্যাতন

হাসপাতালের এই নৈরাজ্যের মাঝে সবচেয়ে বিভৎস ঘটনাটি ঘটেছে নাটোরে। রবিবার (৭ জুন) রাতে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন দুই বছরের সন্তানের মাকে ওষুধ দেয়ার কথা বলে কৌশলে লিফটে ৬ তলার সিঁড়িঘরে নিয়ে যায় আউটসোর্সিং কর্মী অমিত এবং তাকে ধর্ষণ করে।

এই নারকীয় নির্যাতনের দৃশ্য গোপনে মোবাইলে ভিডিও করে সুইপার অনিল ও ওয়ার্ড বয় প্রাঙ্গণ। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তারা ভুক্তভোগীকে কুপ্রস্তাব ও ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে।

সেদিন রাতেই সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আনসার সদস্যরা অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করলেও অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে রাতেই অপরাধীদের সসম্মানে ছেড়ে দেন।

রংপুরে চিকিৎসা অবহেলা

চিকিৎসার অবহেলা ও বর্বরতার অন্য এক নজির গড়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া নূরজাহান বেগমকে এক ঘণ্টা কোনো অক্সিজেন বা জরুরি আইভি লাইন না দিয়ে ফেলে রাখা হয়, যার ফলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। চিকিৎসকদের অবহেলার প্রতিবাদ জানালে স্বজনদের সাথে ধস্তাধস্তি হয় এবং আটকে রাখা হয় এক ভুক্তভোগীর মায়ের মরদেহ।

পরবর্তীতে চরম অপমানের শর্তে বড় ছেলেকে সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করিয়ে তবেই ফেরত দেয়া হয় মায়ের মরদেহ।

স্বাস্থ্য সেবা জনগণের মৌলিক অধিকার হলেও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতি-নির্ধারকদের উদাসীনতা আর কর্মকর্তাদের অমানবিকতায় তা আজ চরম বিপর্যস্ত। একটি অব্যবস্থাপনা বা অপরাধ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। মানুষের শেষ আশ্রয়ের এই হাসপাতালগুলো, সরকারের বাজেট কাজে লাগিয়ে উন্নত সেবা নিশ্চিত করবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।



banner close
banner close