সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা দিতে ১০ বছর ধরে জায়গা, বিদ্যুৎ, পানি ও সরকারি ভর্তুকি সুবিধা পেয়েছে ভারতের স্যান্ডোর ম্যাডিকেইডস প্রাইভেট লিমিটেড। রোগীরা সেবা পাচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সেবার মানও ভালো। তবে এর মধ্যে ধসে পড়েছে সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব সক্ষমতা। জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (নিকডু) হাসপাতালের ৪০টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৮ থেকে ১০টি। বাকিগুলো পড়ে থেকে অকেজো হয়ে গেছে। কাজ হারিয়ে টেকনিশিয়ানদের কেউ বদলি হয়েছেন, কেউ করছেন দাপ্তরিক কাজ।
১০ বছর মেয়াদি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে তাই প্রশ্ন উঠেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে ডায়ালাইসিস সেবা তুলে দিয়ে সরকার কতটা লাভবান হয়েছে এবং কতটা হারিয়েছে নিজস্ব সক্ষমতা।
স্যান্ডোরের ডায়ালাইসিস সেবায় বর্তমানে প্রতিটি সেশনে সরকারকে ২ হাজার ৭৭৭ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। রোগীর অংশসহ এক সেশনের খরচ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯৮ টাকা। এর বাইরে নিকডু ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালকে বহন করতে হচ্ছে স্যান্ডোরের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিল। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে সেবা ভালো হলেও এই মডেল সরকারের জন্য কতটা টেকসই, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ বলেছেন, পিপিপি মন্দের ভালো। তবে যেকোনো চুক্তিতেই দেশের স্বার্থ ও মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার মতে, অনেক চুক্তিতেই দেশের স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা হয় না। চুক্তি সম্পাদনকারীদের অদক্ষতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায় এবং দেশের স্বার্থহানি ঘটে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।
২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্যান্ডোরের সঙ্গে নিকডু ও চমেক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের চুক্তি করে। পিপিপি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এটি স্বাস্থ্য খাতের প্রথম পিপিপি প্রকল্প। চুক্তি অনুযায়ী, বেসরকারি অংশীদারের দায়িত্ব ছিল ডায়ালাইসিস কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। সরকার দেওয়ার কথা ছিল জায়গা ও ইউটিলিটি সুবিধা। পুরোনো কেন্দ্র অকেজো করে সেখানকার কর্মীদের হাসপাতালের অন্য বিভাগে পুনর্বিন্যাসের কথাও ছিল।
২০১৬ সাল থেকে নিকডু ও চমেকে সেবা দিয়ে আসছে স্যান্ডোর। আগামী ৩০ নভেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। চুক্তি নবায়ন নিয়ে এরই মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) মো. নুরুল ইসলাম বলেছেন, চুক্তির মেয়াদ সম্ভবত বাড়ছে না। হাসপাতালগুলো নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার চালাতে চায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।
চুক্তি অনুযায়ী, নিকডু ও চমেক হাসপাতালের জায়গা, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে স্যান্ডোরের কার্যক্রম চলে। বিদ্যুৎ ও পানির বিল দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ডায়ালাইসিসের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও পরিচালনার অন্যান্য খরচ বহন করে স্যান্ডোর।
প্রকল্পের শুরুতে রোগীপ্রতি ডায়ালাইসিসের খরচ ছিল ২ হাজার ১৯০ টাকা। এর মধ্যে রোগী দিতেন ৪০০ টাকা এবং সরকার ভর্তুকি দিত ১ হাজার ৭৯০ টাকা। প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে চার্জ বাড়ায় বর্তমানে রোগীর অংশ ৬২১ টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি ২ হাজার ৭৭৭ টাকা। সব মিলিয়ে এক সেশনের খরচ ৩ হাজার ৩৯৮ টাকা, যা অন্য সরকারি ও অনেক বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেশি।
স্যান্ডোরের বাংলাদেশ শাখার মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নিকডু ও চমেকে ৬ লাখ ৩৮ হাজার ১২১টি ডায়ালাইসিস সেশন হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৩১টি সেশন বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। রোগী অনুপস্থিত থাকায় প্রস্তুতি নেওয়ার পরও ১৩ হাজার ৫৭৬টি সেশন হয়নি। এ সময়ে বাইরের বা বেসরকারি রোগীদের জন্য হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫২১টি সেশন।
নাজমুল হাসানের দাবি, গত ১০ বছরে ডায়ালাইসিসের জন্য সরকারের ভর্তুকি ১২০ কোটির বেশি নয়। সেবার মান ভালো হওয়ায় রোগীরা সন্তুষ্ট বলেও দাবি করেন তিনি। খরচ কমিয়ে চুক্তি নবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে জনপ্রতি ডায়ালাইসিসের খরচ ২ হাজার ৮০০ টাকার নিচে নামানো সম্ভব নয়। এজন্য ডায়ালাইসিসের সংখ্যা বাড়াতে হবে বলে জানান তিনি।
স্যান্ডোরের কার্যক্রম শুরুর আগে নিকডুর নিজস্ব ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে ৪০টি মেশিন সচল ছিল। ছয়জন টেকনিশিয়ান ও নার্সদের সহায়তায় চলত সেবা। বর্তমানে ৮ থেকে ১০টি ছাড়া প্রায় সব মেশিন অকেজো। একটি ডায়ালাইসিস মেশিনের দাম ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা।
কাজ কমে যাওয়ায় ছয় টেকনিশিয়ানের মধ্যে একজনকে গোপালগঞ্জ এবং একজনকে খুলনা হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। একজন এখন অভ্যর্থনা কেন্দ্রে এবং আরেকজন কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি দুজন জরুরি প্রয়োজনে ডায়ালাইসিসে সহায়তা করেন। প্রয়োজন না থাকলে তারা বসে থাকেন।
নিকডুর পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশেদ আনোয়ার বলেছেন, চুক্তির শর্তের কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার চালাতে পারছে না। তবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্র চালুর জন্য চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও যন্ত্রপাতি চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
স্যান্ডোরের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিল বাবদ নিকডুকে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা এবং পানির জন্য ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
চুক্তি চলাকালে নিকডু নতুন করে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের কাজ শুরু করতে পারে না। ফলে প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেবা চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নিকডুর পরিচালক জানান, নতুন কেন্দ্র চালু করতে এক মাস সময় লাগতে পারে। বর্তমানে প্রতিদিন ১১৫ থেকে ১২০ জন রোগী সেখানে ডায়ালাইসিস নেন। চুক্তি না বাড়লে সাময়িকভাবে তাদের অন্য হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন করে সেবা চালু করতে বাস্তবে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। দ্রুত জনবল নিয়োগ সম্ভব হলেও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় ডায়ালাইসিস মেশিন কেনা সময়সাপেক্ষ। তাই রোগীদের কথা বিবেচনায় স্যান্ডোরের কার্যক্রম আরও তিন থেকে ছয় মাস চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) মো. নুরুল ইসলাম বলেছেন, সংকট মোকাবিলায় যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চুক্তি শেষ হলেও ডায়ালাইসিস সেবা ব্যাহত হবে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি ডায়ালাইসিস পুরোপুরি বন্ধ করা ঠিক হবে না। ডায়ালাইসিসে দীর্ঘ বিরতি রোগীর গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করতে পারে। তার পরামর্শ, চুক্তির শর্ত সংশোধন করে একই সঙ্গে সরকারি সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং খরচ কমানোর শর্ত যুক্ত করতে হবে।
কিডনি ডায়ালাইসিস ব্যয়বহুল উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ বলেছেন, বিকল্প ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে না চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে রোগীর আর্থিক ক্ষতি থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত একটি কমিটি করে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা।
নিকডুর স্যান্ডোর কেন্দ্রে তিন বছর ধরে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন শিরীন আহমেদ (৫০)। তিনি বলেন, স্যান্ডোর অথবা সরকার, যে-ই ডায়ালাইসিস সেন্টার পরিচালনা করুক, রোগীরা যেন অব্যাহতভাবে সেবা পান।
কিডনি অ্যাওয়ারনেস, মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষের কিডনি স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে যায়। তাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হয় অথবা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।
জাতীয় কিডনি ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে কমবেশি ১৩০টি প্রতিষ্ঠানে ডায়ালাইসিস সুবিধা রয়েছে এবং ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা প্রায় ৬৫০টি।
আরও পড়ুন:








