ওষুধ অসুস্থ শরীরের জন্য এক স্বস্তির পরশ আর মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর মানুষের জন্য আশার এক ক্ষীণ প্রদীপ। তবে ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ অনেক মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের জন্য ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিলাসিতায়। আর ঠিক এই কারণেই সাধারণ মানুষের ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সরকারি হাসপাতাল। কারণ স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি এখান থেকেই সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র পেয়ে থাকেন। কিন্তু যে দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য রোগী ও স্বজনদের হাহাকার করতে হয় সেই দেশেই একটি সরকারি হাসপাতালের আন্ডারগ্রাউন্ডে বস্তার পর বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পড়ে আছে হাসপাতালের মেঝেতে। এমনই এক গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে বাংলা এডিশন। আর সেই অনুসন্ধানে উঠে আসে এমন কিছু চিত্র যা নতুন করে প্রশ্ন তোলে অব্যবস্থাপনার।
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা মিরপুর-১। এই এলাকার লালকুঠি বাজারের মাজার রোডে অবস্থিত মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালটির আন্ডারগ্রাউন্ডের একটি গোপন কক্ষে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ মজুত রয়েছে। সেই অভিযোগের সূত্র ধরেই সরকারি এই হাসপাতালে উপস্থিত হয় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী টিম।
হাসপাতালে প্রবেশের পর দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা হয় আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেখানে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের কাছে গোপন কক্ষের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা সরাসরি বিষয়টি অস্বীকার করে। তাদের ভাষ্য এখানে এমন কোনো কক্ষই নেই।
কিন্তু সত্যকে যতই আড়াল করার চেষ্টা করা হোক না কেন তার নিজস্ব একটি ভাষা থাকে। অনেক সময় সেই ভাষা দেয়ালের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে। অবশেষে উন্মোচিত হলো দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে পড়ে থাকা এক বিস্ময়কর বাস্তবতা। যেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সাধারণ মানুষের জীবনরক্ষাকারী উপকরণ বস্তার পর বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ। যেন অন্ধকারের ভেতর স্তূপ হয়ে পড়ে ছিল হাজারো মানুষের প্রাপ্য চিকিৎসার নীরব স্মৃতিচিহ্ন।
আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই কক্ষে প্রবেশের পর যেন চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। সরেজমিনে বাংলা এডিশনের ক্যামেরায় উঠে আসে এক চোখ ধাঁধানো চিত্র। বস্তার পর বস্তা সরকারি ওষুধ পড়ে আছে মেঝেতে। ক্যালসিয়াম ভিটামিন প্যারাসিটামল মেট্রোনিডাজলসহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি ওষুধ রয়েছে এর মধ্যে।
যেখানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় সেখানে এত বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ কীভাবে ব্যবহার না হয়েই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনুসন্ধানের আরও গভীরে যায় বাংলা এডিশন।
হাসপাতালের বিভিন্ন করিডোর ঘুরেও দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে। বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সন্দেহ আরো ঘনিভূত করে।
পরিচালকের বক্তব্য
এরপর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের নেপথ্যের ইতিহাস জানতে কথা হয় হাসপাতালটির পরিচালকের সঙ্গে। অবশেষে দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড. ইকবাল কবিরের কার্যালয়ে যায় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী দল।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক দাবি করেন এসব ওষুধ তার দায়িত্ব গ্রহণের সময়ের নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই এসব ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সময়ে কোনো ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
স্টোর পরিদর্শনে অনীহা
অন্যদিকে হাসপাতালের মূল স্টোরেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে বলে বিভিন্ন গোপন সূত্রের বরাতে জানা যায়। এই তথ্য যাচাইয়ের জন্য স্টোরকিপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। একই সঙ্গে হাসপাতালের স্টোর পরিদর্শন করতে চাইলে অপারগতা জানায় কর্তৃপক্ষ।
তানভির স্টোরকিপার মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এমনকি স্টোর তার প্রত্যক্ষ দায়িত্বে নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় একজন স্টোরকিপার যদি বলেন স্টোর তার দায়িত্বে নয় তাহলে সেই দায়িত্বটি কার কাঁধে বর্তায়। আর যদি সেখানে কোনো অনিয়ম না-ই থাকে তাহলে স্টোরের দরজা খুলতে এত আপত্তি কেন।
একদিকে পরিচালকের দাবি তার দায়িত্বকালীন সময়ে কোনো ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়নি। অন্যদিকে স্টোর পরিদর্শনে অনীহা। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থান যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ নয় বরং দুটি ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আর সেই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অন্যান্য অভিযোগ
তবে অনুসন্ধানে শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়ই সামনে আসেনি। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও করিডোর ঘুরে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের চিত্রও উঠে এসেছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান যেন স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশকে বিদ্রূপ করছে।
এ বিষয়ে পরিচালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বাস্তবতার বিপরীতে গিয়ে দাবি করেন তাদের হাসপাতালের পরিবেশ অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন।
এ ছাড়া রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ রোগীর স্বজনদের থাকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব লিফট বিকল থাকাসহ আরও বিভিন্ন অভিযোগ উঠে আসে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে।
একদিকে আন্ডারগ্রাউন্ডের গোপন কক্ষে পড়ে থাকা বস্তার পর বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন এবং রোগীদের ক্ষোভ সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্যসেবার নামে আসলে কী ঘটছে এই প্রতিষ্ঠানে। চিকিৎসার পবিত্র অঙ্গন কীভাবে অব্যবস্থাপনার গোলকধাঁধায় আটকে গেল।
বিশ্লেষকদের মতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওষুধ ব্যবস্থাপনা সংরক্ষণ ও তদারকির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ একটি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের প্রতীক নয় এটি হাজারো মানুষের অধিকারবঞ্চনারও একটি নীরব দলিল। একটি অব্যবস্থাপনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয় এটি গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরও পড়ুন:








