হালকা জ্বর কিংবা সামান্য অসুস্থতায় অ্যান্টিবায়োটিক মেডিসিন হয়ে উঠেছে মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অসুস্থ মানুষের কাছে এটিই শেষ ভরসা। চিকিৎসক যেন আর হাসপাতালে নয়, পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে থাকা প্রতিটি ফার্মেসিতেই তার বিচরণ। আইন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক কেনার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসকের সঠিক প্রেসক্রিপশন। অথচ বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নিয়মের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফার্মেসিতে কীভাবে চলছে অ্যান্টিবায়োটিকের এই অবাধ বেচাকেনা, কারা দিচ্ছে এসব সুযোগ—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে বাংলা এডিশনের টিম।
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা উত্তরা। এই উত্তরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্পট ১ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত উত্তরা মহিলা মেডিকেল কলেজের পাশের মানাফি ফার্মেসি এবং নিউ তামান্না মডেল মেডিসিন শপ। সাধারণ রোগীর বেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সেখানে যায় বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী টিম। রোগী সেজে অ্যান্টিবায়োটিক চাইতেই কোনো ধরনের ডাক্তারি প্রেসক্রিপশন ছাড়াই টিমের হাতে তুলে দেওয়া হয় অ্যামোক্সিসিলিন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মতো শক্তিশালী দুটি অ্যান্টিবায়োটিক।
সাধারণ মানুষের বেশে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার পরপরই বাংলা এডিশনের অনুসন্ধানী টিম আবারও যায় মানাফি ফার্মেসি ও নিউ তামান্না মডেল মেডিসিন শপে। তবে এবার আর সাধারণ মানুষের বেশে নয়, বাংলা এডিশনের ক্যামেরা ও পরিচয় নিয়েই মুখোমুখি হয় সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু বিপত্তি বাধে এখানেই। রোগী পরিচয়ে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি আর সাংবাদিক পরিচয়ে প্রশ্ন করা হলে শুরু হয় নানা ব্যাখ্যা। যে ব্যাখ্যার আগা আছে কিন্তু মাথা নেই।
কখনো মোবাইলে থাকা ওষুধের নামের একটি টেক্সটকেই প্রেসক্রিপশন হিসেবে দেখিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা। আবার কখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে থাকেন এমন যুক্তি দেখিয়ে নিজেদের দায় আড়ালের চেষ্টা।
কিন্তু বাংলা এডিশনের জেরার মুখে অবশেষে ফার্মেসি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক মেডিসিন বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি এভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করাটা অন্যায় হয়েছে বলেও দায় স্বীকার করে তারা।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের দাবি, এমবিবিএস চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করার কোনো নিয়ম নেই। যারা এসব করছে তারা অবশ্যই আইনবহির্ভূত কাজ করছে।
ড. মো. রাসেল ভূঁইয়া জুনিয়র কনসালটেন্ট। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অ্যান্টিবায়োটিক সঠিকভাবে ব্যবহার করলেও ডায়রিয়া, বমি, পেট ফাঁপা ও বদহজমের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ত্বকে চুলকানি বা ফুসকুড়ি থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট, গলা বা মুখ ফুলে যাওয়ার মতো গুরুতর প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা কিংবা অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়ে। আর অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর তৈরির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের প্রায় প্রতি ছয়টির একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পাওয়া গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই হার প্রায় প্রতি তিনটি সংক্রমণের একটিতে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তৈরি হলে ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে যে সংক্রমণ একসময় সহজেই চিকিৎসাযোগ্য ছিল সেটিই পরবর্তীতে কঠিন কিংবা কখনো কখনো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে এই বিষয়টি।
যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এত সতর্কতা, সেখানে দেশের প্রতিটি অলিগলির ফার্মেসিতে হাতুড়ে চিকিৎসার চর্চা আর প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির অভিযোগ যেন থামছেই না। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—ফার্মেসিওয়ালাদের এমন অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির মাত্রা থামবে কবে। এটা এখন দেশের সচেতন মহলের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, মানুষকে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার থেকে দূরে রাখতে হলে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শুধু নিয়ম থাকলেই হবে না, সেই নিয়মের বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে গড়ে উঠতে পারে কার্যকর প্রতিরোধ।
আরও পড়ুন:








