দিন যতই গড়াচ্ছে, দেশে রোগ আর রোগীর সংখ্যা যেন পঙ্গপালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। হাসপাতাল ছোট হোক কিংবা বড়, রোগীর উপচেপড়া ভিড়ে, কোথাও যেন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাও সাধারণ মানুষের জন্য অসাধ্য। হাসপাতালের বারান্দা, করিডোর, সিঁড়ি কিংবা অপেক্ষমাণ কক্ষ, সবদিকেই রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। যেন, চিকিৎসা নিতে নয়, মানুষ এখানে এসেছে ঘর বাঁধতে।
দেশের এসব হাসপাতালে কেউ এসে থাকেন পেটের পীড়ায়, কেউ লিভার-কিডনির জটিলতায়, আবার কেউ দীর্ঘদিনের নানা অসুস্থতায়। সময়ের পরিক্রমায় প্রশ্নটিও হয়ে উঠেছে জটিল, রোগীর এই ঢল কি কেবলই সময়ের স্বাভাবিক পরিণতি? রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কি শুধু সংক্রমণের স্বাভাবিক গতিই দায়ী? নাকি এই অসুস্থতার বিস্তৃত ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও নির্মম কোনো বাস্তবতা?
খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারের প্রভাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মানবদেহে ২০০টিরও বেশি রোগের জন্ম হতে পারে শুধু খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে। যার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ কলেরা, সালমোনেলোসিস, হেপাটাইটিস, বটুলিজম ও ক্যানসারসহ আরও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
জানা যায়, খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক দূষণ শুধু তাৎক্ষণিকভাবে মানবদেহে প্রভাব ফেলে না; বরং তা মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকেও ঠেলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্যে ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ৭১ শতাংশের বেশি মানুষের মৃত্যু শুধু হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের কারণে হয়ে থাকে। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রোগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে খাদ্যে ভেজাল।
জানা যায়, বাংলাদেশের মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, গুঁড়া মসলা, মাংস, দুধ, চাল, ডালসহ একাধিক খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন, সিসা, আর্সেনিক, পারদ, ক্যাডমিয়াম, কীটনাশক ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকসহ নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হয়।
ব্রয়লার মুরগিতে বিষাক্ত অ্যান্টিবায়োটিক
সম্প্রতি, গরীবের মাংস বলে পরিচিত ব্রয়লার মুরগি নিয়েও ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, ব্রয়লার মুরগিতে বিষাক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ থাকা অবস্থাতেই বিক্রি হচ্ছে বাজারে। ফলে, ব্রয়লারের ওই মাংস খেলে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি। ইতোমধ্যেই, যা দেশের বড় একটা অংশের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসবের পিছনে রয়েছে বাংলাদেশের কিছু অসাধু চক্র। যারা প্রতিনিয়ত খাদ্যে এসব ক্ষতিকর ফর্মুলা মিশ্রণ করে দেশের সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকার ব্যাধির জগতে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ফর্মুলা মিশ্রিত খাবার খেয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভোগেন এবং ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য থেকে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও পরিবেশের প্রভাব
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের তথ্যেও উঠে আসে একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ফলমূল ও শাকসবজিতে ফরমালিন এবং কেক ও জিলাপিতে ক্ষতিকর রং মেশানোর কারণে কিডনি ও লিভারে জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ইকবাল কবীর, চিকিৎসক।
এছাড়াও শুধু খাদ্যে ভেজালই নয়, মানুষের চারপাশের পরিবেশও হয়ে উঠছে মানবদেহের রোগব্যাধির বড় উৎস। বিশেষ করে বায়ুদূষণ নীরবে আঘাত করছে মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দূষিত বাতাসের ক্ষতিকর কণা ও গ্যাস শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এমনকি অতি সূক্ষ্ম কণাও ফুসফুস পেরিয়ে রক্তপ্রবাহে পৌঁছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের অসুস্থতার গল্পটি এখন আর শুধু হাসপাতালের বিছানা, ওষুধ কিংবা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে সীমাবদ্ধ নেই। এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের খাবার, চারপাশের পরিবেশ এবং বেঁচে থাকার সামগ্রিক বাস্তবতা। দেশের সচেতন মহলের দাবি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধু হাসপাতাল বৃদ্ধি এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না; বরং এখন সময়ের দাবি, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জন্য একটি নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরি করা।
আরও পড়ুন:








