দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত আর অসহায় মানুষের কাছে সরকারি হাসপাতাল যেন চিকিৎসার এক শেষ আশ্রয়স্থল। যেখানে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা অনেকের জন্যই লাখ লাখ টাকার এক অদৃশ্য বাণিজ্যের বোঝা, সেখানে সরকারি হাসপাতালই হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। বেসরকারি চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচ সামলাতে না পেরে বাধ্য হয়েই নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ভিড় কড়া নাড়ে সরকারি হাসপাতালের দ্বারে।
মানুষের সেই নির্ভরতার জায়গাটিকে আরও শক্তিশালী করতে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে উন্নত চিকিৎসা ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে প্রতিবছরই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় বিশাল একটি বাজেট। বাজেটের পাতায় যার অঙ্ক কখনো কখনো হয়ে ওঠে অর্থের আকাশছোঁয়া ব্যয়।
বিপুল বাজেট বরাদ্দ
জানা যায়, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা আগের অর্থবছর ২০২৫–২৬-এর সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু, প্রশ্ন থেকেই যায়—স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ হওয়া এই বিপুল অর্থের স্রোত কি সত্যিই পৌঁছায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়? নাকি বাজেটের খাতায় অঙ্কের পাহাড় গড়ে উঠলেও হাসপাতালের দরজায় এসে ফুরিয়ে যায় তার বিশালতা?
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে ভোগান্তি
জানা যায়, দেশের অন্যতম প্রধান ও সর্বাধুনিক সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল। তথ্য বলছে, ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের অন্যতম প্রধান ও আধুনিক এই সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে সারা দেশ থেকে প্রতিদিনই ছুটে আসে হাজারো রোগী। মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসায় শেষ আশ্রয়ের ভরসা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব রোগীর প্রত্যাশা থাকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবার।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ অপেক্ষা আর সীমাহীন ভোগান্তি পেরিয়েও সরকারি এই আধুনিক হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অনেক রোগী। চিকিৎসার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসে হাসপাতালের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়েও যেন মিলছে না প্রত্যাশিত স্বস্তি।
তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করার কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই বর্ধিত কার্যক্রম চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি কিছুটা কমবে বলে আশা করছে হাসপাতালটির পরিচালক।
মো. নুরুজ্জামান, পরিচালক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল।
চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সমস্যা
অন্যদিকে, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এর মধ্যে অন্যতম, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও, কাঙ্খিত সেবা না পাওয়া।
চিকিৎসার জন্য মানুষের এই তীব্র আকুলতা যেমন ফুটে উঠেছে ভিডিওতে, তেমনি স্পষ্ট হয়েছে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির নির্মম চিত্রও। চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার যেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সেখানে সেই চিকিৎসার দুয়ারে পৌঁছাতেই কেন সাধারণ মানুষকে পাড়ি দিতে হবে এমন দুর্ভোগের পথ? এই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্লেষকদের মত
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যের হিসাব বাজেটের পাতায় নয়—হিসাব হওয়া উচিত হাসপাতালের বেডে, চিকিৎসকের সেবায়, ওষুধের প্রাপ্যতা আর একজন রোগীর মুখের স্বস্তিতে। কিন্তু, সেই স্বস্তির অপেক্ষায় যদি মানুষকে হাসপাতালের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, বেডের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, আর চিকিৎসার আশায় এসে ফিরে যেতে হয় শূন্য হাতে, তাহলে শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাই নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দও।
আরও পড়ুন:








