সুস্থ চোখের আশায় হাসপাতালে এসে উল্টো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে রোগীরা। ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে টিকিট পেতে প্রতিদিন ভোরেই শুরু হয় যেন দৌড় প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে উঠে এসেছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের এই করুণ বাস্তবতা।
কয়েকদিন আগের ভোর পাঁচটা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মূল ফটকের সামনে শত শত মানুষের অপেক্ষা। গেট খুলতেই শুরু হয় জীবনের ঝুঁকি নেয়া এক দৌড় প্রতিযোগিতা। কে কার আগে টিকিট কাউন্টারে পৌঁছাবেন সেই লড়াইয়ে নারী পুরুষ কিংবা প্রবীণ বাদ যাচ্ছে না কেউ। এ সময় ধাক্কাধাক্কিতে এক নারীকে মাটিতে আছড়ে পড়তেও দেখা যায় যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার তীব্র আকুলতা এবং একই সাথে চরম ভোগান্তির চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
দেশের সর্বোচ্চ সরকারি বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই হাসপাতাল। চোখের জটিল রোগের চিকিৎসা চিকিৎসক তৈরির শিক্ষা কার্যক্রম এবং উচ্চতর গবেষণার সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার রোগী স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসার আশায় এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু ২৫০ শয্যার এই বিশাল কাঠামোর বিপরীতে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় বহির্বিভাগে তৈরি হচ্ছে তীব্র চাপ আর বিশৃঙ্খলা। ফলে চিকিৎসার আশায় ভোরের আলো ফোটার আগেই হাসপাতালের লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে শত শত রোগী।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও যখন সময়মতো চিকিৎসকের সাক্ষাৎ মেলে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ টিকিট সংগ্রহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম সমন্বয়হীনতা ও হয়রানি। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে।
প্রতিদিন হাজারো রোগীর পদচারণায় মুখর রাজধানীর এই বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতাল। মাত্র ১ হাজার থেকে বারোশো রোগীর সেবা দেয়ার সক্ষমতা নিয়ে কাঠামোগতভাবে গড়ে উঠলেও বর্তমানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মানুষ। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি রোগীর চাপ এবং প্রতিদিন গড়ে শতাধিক অস্ত্রোপচার সামলাতে গিয়ে একপ্রকার হিমশিম খাচ্ছে বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ড. এ.এস.এম.এম কাদীর পরিচালক জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এই দীর্ঘ অপেক্ষার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল চক্র টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল পাইয়ে দেয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে রয়েছে এমন অভিযোগ। এসব অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও লিখিত অভিযোগ পেলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
হাসপাতালের সেবার পরিধি বাড়াতে ১০ তলা নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালেও। ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের অন্যতম প্রধান ও সর্বাধুনিক এই সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে মস্তিষ্ক মেরুদণ্ড এবং স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগের সেবা নিতে আসে হাজারো মানুষ। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও এখানে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা।
তবে কর্তৃপক্ষ বলছে ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করার কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই বর্ধিত কার্যক্রম চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি কিছুটা কমবে বলে আশা করছে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো নুরুজ্জামান।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছে শুধু অবকাঠামো বা বাজেট বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সঠিক সমন্বয় এবং সেবার বিকেন্দ্রীকরণ করা না গেলে বিশেষায়িত এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন:








