বেসরকারি হাসপাতাল ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের লাইসেন্স, স্থায়ী ক্যাম্পাস এবং নিজস্ব জমি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মেডিকেল কলেজ পরিচালনার জন্য এসব শর্ত বাধ্যতামূলক হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো তা পূরণ করতে পারেনি। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে কলেজটির অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট, ফ্লোর স্পেসের ঘাটতি এবং অন্যান্য একাডেমিক সীমাবদ্ধতার বিষয়ও উঠে এসেছে।
বর্তমানে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ (মহিলা ও শিশু) ভবনে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনটির প্রথম থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত শিশু, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও অষ্টম থেকে দ্বাদশ তলা পর্যন্ত কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল ও স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকা বাধ্যতামূলক।
২০০২ সালে কলেজটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলেও ২৪ বছরেও নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কলেজটিতে ৭১৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষার্থীসংখ্যা অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৪ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস প্রয়োজন হলেও রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৪ বর্গফুট। ফলে প্রায় ১ লাখ বর্গফুট ফ্লোর স্পেসের ঘাটতির কারণে শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য শিক্ষা-সহায়ক সুবিধায় সংকট তৈরি হয়েছে।
অবকাঠামো ও একাডেমিক সুবিধার ঘাটতি
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী একটি মেডিকেল কলেজে নির্ধারিত সংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি, মিলনায়তন, সেমিনার কক্ষ, অফিস কক্ষ, শিক্ষার্থীদের পৃথক কমন রুম, পর্যাপ্ত ফ্লোর স্পেস, শিক্ষক ও টেকনিক্যাল স্টাফ, শিক্ষা উপকরণ, আধুনিক পাঠাগার, ল্যাব, খেলাধুলা, বিনোদন, আবাসনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকা বাধ্যতামূলক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব সুবিধার অনেক ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে।
কলেজটির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, অর্ধেকের বেশি ফ্লোর স্পেসের ঘাটতির কারণে ঘিঞ্জি পরিবেশে পাঠদান চলছে। এতে চিকিৎসা শিক্ষার মান ও স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত ফ্লোর স্পেস নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জমি ও হাসপাতালের লাইসেন্স নিয়ে জটিলতা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ২০২৩ সালে ১৮০৬ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অনুকূলে রমনা মৌজার ২ একর জমি দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে কলেজটি সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ (মহিলা ও শিশু) ভবনে স্থানান্তর করা হয়।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন অনুযায়ী, ৫০ শিক্ষার্থীর আসনবিশিষ্ট একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের জন্য ন্যূনতম ১ একর নিজস্ব জমি থাকতে হবে। এছাড়া আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে জমি, ফ্লোর স্পেস, হাসপাতালের শয্যা এবং অন্যান্য অবকাঠামো বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির দীর্ঘমেয়াদি লিজ নেয়া জমির অনাপত্তির ভিত্তিতে ২০০২ সালে কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে এটি বারডেম জেনারেল হাসপাতাল-২ ভবনে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কলেজ ক্যাম্পাস থেকে প্রশিক্ষণ হাসপাতাল দূরে অবস্থিত।
শিক্ষকসংকট ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে দুজন, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগে চারজন, প্যাথলজি বিভাগে একজন, মেডিসিন বিভাগে একজন এবং শিশু বিভাগে ছয়জন শিক্ষকের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া কলেজে কোনো অডিটোরিয়াম নেই। প্রতিটি বিভাগে দুটি করে টিউটোরিয়াল কক্ষেরও ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কলেজের নামে তপশিলি ব্যাংকে ৬০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানতের ঘাটতি পাওয়া গেছে।
চিকিৎসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মেডিকেল কলেজে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক এবং মানসম্মত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের অভাব ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, একটি মেডিকেল কলেজ থেকেই ভবিষ্যৎ চিকিৎসক তৈরি হয়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিজস্ব জমি। বর্তমানে যে জমিতে কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেটি ট্রাস্টের হওয়ায় হাসপাতালের নামে জমি কেনা এবং লাইসেন্স নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিকে (বাডাস) এ বিষয়ে বারবার বলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নিজস্ব জমি ও ভবনের সংকটের কারণে হাসপাতালের নামে লাইসেন্স করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় কলেজটি বন্ধ করে দেয়া সমাধান নয়। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জমি কেনার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তুলনায় ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ এগিয়ে। তবে ঘাটতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হবে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সব মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তাদের নিজস্ব হাসপাতাল নেই এবং তারা অন্য হাসপাতালকে নিজেদের হিসেবে দেখাচ্ছে কি না, তা আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং নিরপেক্ষ সরকারি তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:








