থাইরয়েড ও ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধি নির্ণয়ে প্রতিষ্ঠিত খুলনা পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন সাধারণ রোগীরা। সকাল সাড়ে ৮টার আগেই সিরিয়াল নেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ফিরে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জরুরি প্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ৮-১০ দিন বিলম্বের কথা বলে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেবাকেন্দ্রের এই বেহাল দশার জন্য ভুক্তভোগীরা দায়ী করেছেন কেন্দ্রের পরিচালক ডা. ঝর্ণা দাসকে, যিনি টানা ২১ বছর ধরে একই কেন্দ্রে কর্মরত আছেন।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস), খুলনা। কেন্দ্রের সেবার পরিধি বাড়লেও জনবল সংকট প্রকট বলে জানা গেছে, যার কারণে এক পদের কর্মীকে দিয়ে অন্য পদের কাজ করানো এবং আউটসোর্সিং কর্মী দিয়ে চাহিদা পূরণের অভিযোগ রয়েছে। এতে কাজের মান খারাপ হচ্ছে এবং অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি বাড়ছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসবের প্রতিকার চেয়ে তারা পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর একাধিকবার আবেদন করেছেন এবং কেনাকাটায় দুর্নীতি তদন্তের জন্য কমিশনের পরিচালক (অর্থ)-এর কাছেও আবেদন জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে দেখা গেছে, সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে সিরিয়াল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা রোগীরা ফিরে যেতে বাধ্য হন। চারটি অত্যাধুনিক মেশিন থাকা সত্ত্বেও দৈনিক মাত্র ২৫-৩০টি আলট্রাসনো করা হয় বলে জানা গেছে। হরমোন ও থাইরয়েড পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ৮-১০ দিন সময় লাগার কথা জানিয়ে কাউন্টারে কর্মরতরা রোগীদের দ্রুত রিপোর্টের জন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অথবা সন্ধানী ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মী জানান, পরিচালকের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে কেন্দ্রে অনিয়ম বেড়েছে। ২০০৫ সালে চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর পদোন্নতি পেয়ে ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর মুখ্য চিকিৎসা কর্মকর্তা ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান ডা. ঝর্ণা দাস। পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রের চাকরিবিধিতে এক কেন্দ্রে তিন বছরের বেশি কাজ করার সুযোগ না থাকলেও তিনি টানা ২১ বছর ধরে একই কেন্দ্রে কর্মরত আছেন বলে কর্মীদের অভিযোগ। কর্মীদের দাবি, অপছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনি প্রকাশ্যে অপমান করেন, খারাপ এসিআর দেন এবং হয়রানিমূলকভাবে অন্যত্র বদলি করেন। এর প্রতিবাদে কেন্দ্রের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী একযোগে বদলির আবেদন করেছিলেন বলে জানা গেছে।
কর্মীদের অভিযোগ, ডা. ঝর্ণা দাস উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠন ইসকনের সক্রিয় সদস্য ও দাতা। তাদের দাবি, ইসকন সদস্যরা নিয়মিত তার কাছে যাতায়াত করেন এবং প্রায়ই দরজা বন্ধ করে বৈঠক হয়, সে সময় কক্ষে অন্য কোনো কর্মীর প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে। অভিযোগে আরও বলা হয়, ইসকন সদস্যরা বিনামূল্যে পরীক্ষা করান এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই রিপোর্ট পেয়ে যান, অথচ সাধারণ রোগীদের রিপোর্টের জন্য দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শুভ বলরাম ও জগন্নাথ দাস নামে দুই ব্যক্তি বিনামূল্যে হোল অ্যাবডোমিন আলট্রাসনো করিয়েছেন বলে তার রসিদ পাওয়া গেছে। এছাড়া 'শ্রীমতি ঝর্ণা দেবী দাসী' নামে ইসকনে চাঁদা প্রদানের একটি রসিদ সংরক্ষিত থাকার দাবিও করা হয়েছে।
পরিদর্শনে জানা যায়, পরিচালক হওয়ার পর থেকে ডা. ঝর্ণা দাস সরাসরি রোগী দেখা থেকে বিরত থাকলেও সপ্তাহে ছয়দিন খুলনার একাধিক বেসরকারি প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনো ও টিভিএস পরীক্ষা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানকার ফি পরমাণু কেন্দ্রের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। নগরীর কেডিএ অ্যাভিনিউয়ের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তিনি সরকারি গাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রে গেলে ডা. ঝর্ণা দাসকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত সহকারী জানান, তিনি ছুটিতে আছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ডা. ঝর্ণা দাস বলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে তাদের নিষেধ রয়েছে। লিখিত আবেদন নিয়ে ঢাকায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ কল ও খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
আরও পড়ুন:








