মঙ্গলবার

১৬ জুন, ২০২৬ ২ আষাঢ়, ১৪৩৩

ফার্মেসিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অনীহা: মান হারাচ্ছে ওষুধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ জুন, ২০২৬ ১১:৫৬

শেয়ার

ফার্মেসিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অনীহা: মান হারাচ্ছে ওষুধ
প্রতীকী ছবি

দেশে যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বেশির ভাগ ফার্মেসিতেই জীবন রক্ষাকারী ওষুধের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখার নিয়ম থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে গুণমানহীন ওষুধ সেবন করে রোগীরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫২১টি নিবন্ধিত ফার্মেসি রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজারের মতো মডেল ফার্মেসি এবং প্রায় ১ লাখ মডেল মেডিসিন শপ রয়েছে। অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, মডেল ফার্মেসিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) থাকা বাধ্যতামূলক এবং দোকানের তাপমাত্রা সব সময় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা আবশ্যক। তবে একটি জাতীয় দৈনিকের সাম্প্রতিক সরেজমিন পর্যবেক্ষণে ঢাকা, পিরোজপুর ও কুমিল্লার ৫০টি ফার্মেসির মধ্যে ৪৬টিতেই কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।

ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বাজারে প্রচলিত ৯০ শতাংশ ওষুধ ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে রাখার নিয়ম। ইনসুলিন বা ভ্যাকসিনের মতো প্রোটিনভিত্তিক ওষুধ ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করতে হয়। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, গ্রীষ্মকালে দেশের তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। সাধারণ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত সহনীয় হলেও এর বেশি হলে ওষুধের রাসায়নিক উপাদান ভাঙতে শুরু করে এবং কার্যকারিতা হারায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার জানান, ওষুধের গায়ে লেখা মেয়াদ কেবল নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও শর্ত মেনে সংরক্ষণের ক্ষেত্রেই কার্যকর থাকে। অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ওষুধের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এই সংকটের গভীরতা বুঝতে স্বাধীন গবেষণার প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। পিরোজপুরের প্রিন্স মেডিকেল হলের কর্মচারী আলী হোসেন জানান, বিশেষ কিছু ওষুধের জন্য ফ্রিজ থাকলেও সাধারণ ওষুধগুলো কেবল সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখা হয়।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন জানান, সিংহভাগ ওষুধ ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার নিয়ম থাকলেও দেশের সব লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসিতে এসি নেই। তবে যেখানে নিয়ম মানা হচ্ছে না, সেখানে জরিমানা ও মামলা করা হচ্ছে। রাজশাহীর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কামরুল হাসান দাবি করেন, লাইসেন্স দেওয়ার সময় শর্তগুলো লিখিতভাবে দেওয়া হয় এবং তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড স্টোরেজ প্র্যাকটিস নির্দেশিকা অনুযায়ী, কারখানা থেকে খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই সমান গুরুত্ব দিয়ে ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে। কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. হাসমতুজ্জামান জানান, কারখানায় কঠোর নিয়ম মানা হলেও খুচরা পর্যায়ে তাপমাত্রা নিশ্চিত করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তদারকি ও সচেতনতার অভাবে এই বিশাল সংখ্যক ফার্মেসিতে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে।



banner close
banner close