খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের তৃতীয় তলায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে সৃষ্ট আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন দুজন এবং হৃদরোগ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন একজনসহ মোট তিন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার ভোর পৌনে ছয়টার দিকে আগুন লাগে এবং প্রায় এক ঘণ্টা পর তা নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় নার্স ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যসহ পাঁচ থেকে ছয়জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পরিচয়
নিহত তিনজন হলেন কয়রা উপজেলার নাসরিন নাহার, দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী গ্রামের শেখ আবুল হাশেম এবং রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের সাত্তার লস্কর। নাসরিন নাহার ও শেখ আবুল হাশেম আইসিইউতে এবং সাত্তার লস্কর সিসিইউতে ভর্তি ছিলেন।
ঘটনার বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভোর পৌনে ছয়টার দিকে ভবনের তৃতীয় তলার স্টোররুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় বেশিরভাগ মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। ধোঁয়ায় অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।
আইসিইউ ও সিসিইউ থেকে দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। পোস্ট অপারেটিভ রুম থেকে মুমূর্ষু রোগীদের পেছনের দরজা দিয়ে বের করা হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা আটকে পড়া নার্সদের উদ্ধার করেন।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ আহমেদ জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে বিভিন্ন স্টেশনের ১১টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে অগ্নিনির্বাপণ শুরু করে এবং প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্নমত
আইসিইউ ইনচার্জ সহকারী অধ্যাপক ডা. দিলীপ কুমার জানান, আইসিইউতে ১৫টি সিটেই রোগী ছিলেন। আগুন লাগার পর পরই রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নাসরিন নাহারকে অক্সিজেন সরিয়ে নিচে নামানোর সময় তাঁর মৃত্যু হয় এবং শেখ আবুল হাশেম অগ্নিকাণ্ডের আগেই মারা গিয়েছিলেন।
তবে শেখ আবুল হাশেমের ছেলে আব্দুর রহমান দাবি করেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অক্সিজেনের অভাবেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছে।
সিসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. মোস্তফা কামাল জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কে তিনজন রোগী সিসিইউ ছেড়ে বাইরে চলে যান। তাঁদের মধ্যে পাঁচ নম্বর বেডের রোগী সাত্তার লস্কর মারা যান। বাকি দুজন সিসিইউতে ফিরে আসেননি।
আহতদের পরিচয়
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ আহত হয়েছেন। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী আনসার কমান্ডার এসিপি মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় গ্রিল কাটতে গিয়ে গ্রিল ভেঙে পড়ে দুজন স্টাফ নার্স ও একজন ফায়ার সার্ভিস সদস্য আহত হন।
ক্ষয়ক্ষতি
হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম জানান, আগুনে মেরামতযোগ্য ও পরিত্যক্ত ১২টি বেড, দুটি অকেজো এয়ার কন্ডিশনার, অপারেশন থিয়েটারের দরজা এবং ভবনের দেয়াল ও ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। সহযোগী অধ্যাপক (অ্যানেসথেসিওলজি) ডা. দিলীপ কুমার কুণ্ডুকে সভাপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামানকে সদস্যসচিব করে গঠিত এ কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শন ও প্রতিক্রিয়া
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে খুলনায় অবস্থানরত স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গঠিত কমিটি সঠিকভাবে গঠিত হয়নি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের পরামর্শে নতুন কমিটি গঠন করা হবে এবং সেই কমিটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।
রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, অপারেশন থিয়েটারে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চলে, এমন পরিবেশে এভাবে আগুন লেগে সব পুড়ে যাওয়াটি রহস্যজনক এবং এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
খুলনা সদর হাসপাতালেও অনিয়মের চিত্র
একই দিন সকাল সাড়ে দশটায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে যান। সেখানে কয়েকজন রোগী র্যাবিস ভ্যাকসিন পেতে হয়রানির শিকার হওয়ার এবং ২৫০ টাকায় ভ্যাকসিন কিনতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক গাজী রফিকুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১১ মে পর্যন্ত এআরভি ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়। তবে মন্ত্রী ঘটনাস্থল থেকেই ঢাকায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন, সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কোনো চাহিদাপত্রই পাঠানো হয়নি। তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
রান্নাঘর পরিদর্শনে রোগীদের জন্য প্রস্তুত করা খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং উন্নত মানের খাবার সরবরাহের নির্দেশ দেন। পরিদর্শনে আরও ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত এবং সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন।
আরও পড়ুন:








