দেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অনেক শিশুর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে নিউমোনিয়া, খিঁচুনি, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্ধত্ব, এমনকি স্নায়ুবিক জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, কোনো শিশু হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে সাধারণ চিকিৎসায় দ্রুত সাড়া মিলছে না। তিনি বলেন, “সাধারণ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ৯৫ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকে দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া হলে ডাবল অ্যান্টিবায়োটিক দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করছে না।”
তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুর শরীরের সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই এ সময়ে শিশুদের পুষ্টিকর ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অপুষ্টি, দেরিতে চিকিৎসা শুরু এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণেই পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তিনি বলেন, “নিউমোনিয়া শুধু ফুসফুস নয়, অনেক সময় মস্তিষ্কসহ অন্যান্য অঙ্গেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, টিকাদানে গাফিলতি, জনস্বাস্থ্য খাতে অবহেলা এবং ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট আয়োজিত “হামে শিশুমৃত্যু : জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং দেশের টিকাদান কর্মসূচি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার প্রতিফলন।
সংবাদ সম্মেলনে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, দেশে বয়স্ক ও নবজাতকদের জন্য আইসিইউ থাকলেও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পিআইসিইউ নেই। এছাড়া ৯ মাস বয়সের আগেই শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা দুজনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। একই সময়ে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছে ৯৬১ শিশু এবং নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১০৮ শিশুর।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৭৯ শিশু এবং নিশ্চিত হামে ৭৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৩ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৬ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেছে ৫৬ হাজার ৫৭২ শিশুর মধ্যে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪১ হাজার ২৮ শিশু। নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে সাত হাজার ৫২৪ জনের শরীরে। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ হাজার ৬৪৫ শিশু।
আরও পড়ুন:








