দেশে বর্তমানে এইডসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন আট হাজার ৫০০ জন। তাদের প্রায় অর্ধেকই সমকামী। আর সমকামী আক্রান্তদের ৮০ শতাংশই শিক্ষার্থী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য বলছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা এই তালিকায় রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের ধরন বদলে গেছে—একসময় যৌনকর্মী ও মাদকসেবীদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি থাকলেও এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে সমকামীরা, যাদের বড় অংশই তরুণ শিক্ষার্থী।
১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩১৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন দুই হাজার ৬৬৬ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আট হাজার ৫০০ জন ভর্তি রয়েছেন ১৬টি মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালে। তবে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা, কারণ সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেকে চিকিৎসা নিতে আসেন না।
জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, সমকামী আক্রান্তদের ২১ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে, ৩১ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ২৪ বছর। অর্থাৎ মোট আক্রান্ত সমকামীদের অর্ধেকের বেশি বয়স ১০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে।
রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে গত বছর ২৯৩ জনের এইডস শনাক্ত হয়েছিল। চলতি বছর প্রতি মাসে ২৮ থেকে ৩০ জনের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে, যাদের ৭০ শতাংশই সমকামী। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২০২৫ সালে দুই হাজার ৯২টি পরীক্ষায় এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে ২৭২ জনের। এর মধ্যে পুরুষ সমকামী ১১৭ জন, আর তাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এক হাজার ২৪১ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ১৮ জন—তাদের মধ্যে ১২ জনই সমকামী এবং আটজন শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই চিত্র।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. লিটন খান জানান, একসময় যৌনকর্মী ও মাদকসেবীদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি থাকলেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সমকামীদের মধ্যে। তাদের বড় অংশই শিক্ষার্থী, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেকে এখনও লক্ষণ নিয়ে গোপনে রয়েছেন। পরিবেশ না পাওয়ায় কেউ কেউ কাছের মানুষদের সঙ্গেও আলোচনা করতে ভয় পান, কারণ এইডস আক্রান্ত জানলেই সামাজিকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর চেয়ে সমকামীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার অনেক বেশি, কারণ এ ক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। একসময় শীর্ষে ছিল নারী যৌনকর্মীরা, কিন্তু পর্যাপ্ত কাজ হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে। পরে মাদকসেবীদের মধ্যে বিস্তারও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এখন সমকামীদের মধ্যে বেশি ছড়াচ্ছে—শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের যেসব দেশে এইচআইভির প্রকোপ রয়েছে সেখানেও একই পরিস্থিতি।
তবে সমকামীদের সেবার আওতায় আনাটি চ্যালেঞ্জিং জানিয়ে তিনি বলেন, সমকামিতা সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে অস্বীকার করা হয়, ফলে সেবা কার্যক্রমে বাধা আসে। মাদকসেবী ও যৌনকর্মীকে যেমন সহজে শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, সমকামীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি বিপরীত। এখানে জড়িতরা প্রায় সবাই শিক্ষিত, অনেকের সমাজে অবস্থান রয়েছে—তাই তারা গোপন রাখে।
২০২১ সালে দেশে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭২৯ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪৩৮ জনে এবং ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে এক হাজার ৮৯১ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্ত বৃদ্ধির পেছনে পরীক্ষার হার বৃদ্ধিকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর হার কমেছে—২০২৪ সালে মারা গেছেন ৩২৬ জন, ২০২৫ সালে ২৫৪ জন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেন আক্রান্তের হার বাড়ছে, তা গবেষণার বিষয়। এইচআইভি নিয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বড় আকারে কর্মসূচি ঠিক করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে—নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করবে দুটি দেশ।
অন্যদিকে, এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের কর্মীরা ২২ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালে অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব এখনও অনুমোদন না পাওয়ায় বিনা বেতনেই চালিয়ে যেতে হচ্ছে কাজ। দেশের ২৩ জেলায় মোট ৫৮টি পদে কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। বেতন সংকটের কারণে ডায়াগনোসিস ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, সমকামিতা মূলত অভ্যাসগত ও মানসিক অবস্থা। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এটি আছে, কিন্তু সামাজিকমাধ্যমের মতো নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় আগে তারা গোপনে থাকত। এখন তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে, সামনে আসছে। তিনি সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির তাগিদ দেন। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, সমকামী হলেই তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে, আবার সমকামিতার পক্ষে রাস্তায় নামতে হবে—দুটোর কোনোটি হওয়া উচিত নয়। এতে করে জড়িতদের চিকিৎসা ও ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তখন নীরবে এইডস ছড়াবে।
চলতি অর্থবছরে এ খাতে সরকারের বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকার বেশি। গ্লোবাল ফান্ডের বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ মিলিয়ন ডলার, যা আগামী তিন বছরে কমে ১৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০৩২ সালের পর স্থায়ীভাবে বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে সরকারকে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন:








