রবিবার

১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

টিকা সংকটে ৩০ লাখ শিশু ঝুঁকিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৭

শেয়ার

টিকা সংকটে ৩০ লাখ শিশু ঝুঁকিতে
ছবি সংগৃহীত

দেশে অন্তত ৩০ লাখ শিশু ১১টি প্রতিরোধযোগ্য মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। টিকা না পাওয়া বা নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণ না করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে এবং পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকারসহ নির্মূল হওয়া রোগ পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দেড় বছরে টিকাদান কর্মসূচি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। টিকা কেনায় জটিলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতির কারণে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা এক বছরের জন্ম নেওয়া শিশুর সমান বা তারও বেশি হয়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে ৫৯ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ওই বছর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১৬ লাখ ৬৮ হাজার শিশু টিকা পায়নি। ২০২৪ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, টিকা সরবরাহে বিলম্ব হলেও সামগ্রিক টিকাগ্রহণের হার ৯০ শতাংশের বেশি ছিল। তবে ড্যাশবোর্ডের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, স্বাস্থ্য সহকারীদের বেতনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তথ্য হালনাগাদ ব্যাহত হয়েছে এবং শিগগিরই সংশোধিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, দেশে বর্তমানে হামের বড় প্রাদুর্ভাব চলছে, যেখানে হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। তাঁর মতে, টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়া শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি, যা বর্তমানে অর্জিত হয়নি।

টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছরে একটি বড় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশুদের আওতায় আনার কথা থাকলেও তা হয়নি। ফলে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে এবং এর প্রভাব হিসেবে সংক্রামক রোগের বিস্তার দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালে অপারেশন প্ল্যান বাতিল করে রাজস্ব খাত থেকে টিকা কেনার নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়। এতে প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় টিকা সরবরাহ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল ও সরঞ্জামের অভাবও টিকাদান কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছে।

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা গেছে, কোথাও টিকা থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মী থাকলেও টিকার ঘাটতি রয়েছে। দেশে প্রায় দেড় লাখ টিকাকেন্দ্র থাকলেও প্রায় ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সহকারীর পদ শূন্য রয়েছে, যা কার্যক্রমকে আরও দুর্বল করেছে।

টিকা ঘাটতির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অপচয়ের বিষয়ও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক ক্ষেত্রে একটি শিশুকে টিকা দিতে একটি ভায়াল খুলতে হয়, যার বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে এই অপচয়ের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।

এদিকে শিশুদের পুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন এক বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কমসংখ্যক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মঞ্জুর আল মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, ভিটামিন-এ কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জাতীয় পুষ্টি সেবার সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানা জানান, অপারেশন প্ল্যান বন্ধ থাকায় ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহ ও বিতরণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করা, জনবল সংকট দূর করা এবং বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশুদের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অন্যথায় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।



banner close
banner close