রবিবার

১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

হাম প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যু, তদন্ত অনিশ্চিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০৫

শেয়ার

হাম প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যু, তদন্ত অনিশ্চিত
ছবি এআই জেনারেট

দেশে অতি সংক্রামক হাম ও এর উপসর্গে গত আড়াই থেকে তিন মাসে দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু এবং অন্তত ৩০ লাখ শিশুর টিকাবঞ্চনার ঝুঁকির তথ্য সামনে আসার পর দায় নিরূপণ ও তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জোরালো হলেও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিন নতুন মৃত্যুর খবরও আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ অবস্থায় টিকাদান কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাস্থ্য খাতের পূর্ববর্তী ও বর্তমান নীতিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা গেছে। জাতীয় সংসদ ও বিভিন্ন সেমিনারে সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তি পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়কার ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা এবং পরবর্তী সময়ে টিকা ক্রয় ও মজুদ ব্যবস্থার পরিবর্তনকে বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী করার কথা জানান। অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অতীত দুই আমলের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করার বক্তব্য পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপাত্তে বলা হয়েছে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহায়তায় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের কর্মসূচির আওতায় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই কাঠামোগত পরিবর্তন, বাজেট বরাদ্দ প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ক্রয় পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব তৈরি হয়। এতে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে শিশুদের একটি বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানিয়েছেন, পূর্বের উন্নয়ন বাজেট থেকে টিকা কেনার পরিবর্তে রাজস্ব খাতে নেওয়ার ফলে অর্থ ছাড় ও ক্রয় প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। এতে টিকা সরবরাহে বিলম্ব ঘটে এবং সংকট তৈরি হয়। তিনি জানান, ইউনিসেফের মাধ্যমে আংশিক টিকা সংগ্রহ করা হলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যায়, ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ কারণে টিকাদান কর্মসূচির ব্যর্থতা বা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের মাধ্যমে নিরূপণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ১৯৫৬ সালের কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট অনুযায়ী সরকার চাইলে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে পুরো ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণ করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের একাংশের মতে, তদন্তে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে পৃথক তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

এদিকে এ বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে, যেখানে সংক্রমিত এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রম সাময়িকভাবে ভার্চুয়াল মাধ্যমে চালু রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারকে তদন্ত কমিশন গঠনের অনুরোধ জানিয়ে লিগ্যাল নোটিশও পাঠানো হয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম পুনরুদ্ধার, পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যদিকে আইনজীবীদের মতে, দায় নিরূপণ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের স্বাস্থ্য সংকট পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিশন গঠন বা আনুষ্ঠানিক দায় নিরূপণের কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ও প্রশ্ন বাড়ছে।



banner close
banner close