শনিবার

১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

টিকার সংকটে বাড়ছে ২৬ রোগের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৪৬

শেয়ার

টিকার সংকটে বাড়ছে ২৬ রোগের ঝুঁকি
ছবি এআই জেনারেট

দেশে টিকার ঘাটতি ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ এবং টিকা সংগ্রহে জটিলতার কারণে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে জনস্বাস্থ্যে পড়তে শুরু করেছে।

স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) দীর্ঘদিন ধরে দেশের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ২০২৪ সালের জুনে এর চতুর্থ পর্যায় শেষ হওয়ার পর পঞ্চম পর্যায় শুরু হলেও গত বছরের মার্চে হঠাৎ করে অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যায়। এতে ৩৮টি কর্মসূচির অধিকাংশই স্থবির হয়ে পড়ে এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনেও ধীরগতি দেখা দেয়।

ওপি বন্ধ হওয়ার ফলে হাম-রুবেলা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপসহ অন্তত ২৬টি রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগও বাড়তে শুরু করেছে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

টিকাদান কর্মসূচিতে বিপর্যয়

ওপি বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-তে। আগে গ্যাভির সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে দ্রুত টিকা কেনা হলেও নতুন সিদ্ধান্তে সেই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়। পরে আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকার ঘাটতি তৈরি হয়। এতে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি।

শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মাধ্যমে ১১টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। এর মধ্যে বিসিজি টিকা যক্ষ্মা প্রতিরোধে, পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। পোলিও প্রতিরোধে ওপিভি ও আইপিভি, নিউমোনিয়ার জন্য পিসিভি, হাম-রুবেলার জন্য এমআর, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি এবং রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার জন্য ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এসব কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।

প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বন্ধের প্রভাব

ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন, জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ, ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিসহ একাধিক কার্যক্রম গত এক বছরে বন্ধ রয়েছে। এতে শিশুদের অপুষ্টি, কৃমি সংক্রমণ, রাতকানা ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি ফের বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে অর্থায়ন ও ওষুধ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এইচআইভি শনাক্তকরণ কিটের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। অন্যদিকে, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও কিশোরীদের জন্য আয়রন-ফলিক এসিড সরবরাহ বন্ধ থাকায় রক্তস্বল্পতা ও গর্ভকালীন জটিলতা বাড়তে পারে।

অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে উপজেলা পর্যায়ের এনসিডি কর্নারগুলোতেও দেড় বছর ধরে ওষুধ সংকট চলছে। এতে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের রোগীরা নিয়মিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জনবল সংকট ও অনিশ্চয়তা

ওপি বন্ধের পর স্বাস্থ্য খাতের প্রায় ৪৫ হাজার কর্মীর বড় অংশ অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজার কর্মী রাজস্ব খাতে বেতন পেলেও বাকি প্রায় ২৬ হাজার কর্মীর বেতন বন্ধ রয়েছে, যা সেবা ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, পরিকল্পনা ছাড়া ওপি বন্ধ করায় সংক্রামক ও অসংক্রামক উভয় ধরনের রোগই বাড়ছে। দ্রুত বিকল্প অর্থায়ন ও কর্মপরিকল্পনা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সির মতে, পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত নতুন কৌশল নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সরকারের অবস্থান

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, টিকা সরবরাহ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারে দ্রুত নতুন প্রকল্প ও অপারেশন প্ল্যান চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যক্ষ্মা পরীক্ষার কিট ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে।



banner close
banner close