দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি, জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে চাপে রয়েছে। করোনা মহামারির পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হলেও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও উন্নয়ন বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির ১ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী এ খাতে অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে বরাদ্দের বড় অংশ বেতন-ভাতায় ব্যয় হওয়ায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবার মানোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, বিদ্যমান বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাই এখনও গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস ছাড়া বাড়তি বরাদ্দও যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
জনবল সংকটও স্বাস্থ্য খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশে প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ০ দশমিক ৮৩ জন। মোট প্রায় ৯০ হাজার চিকিৎসক রোগী সেবা দিচ্ছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। নার্সের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশে যেখানে ৩ লাখের বেশি নার্স প্রয়োজন, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৫৬ হাজার ৭৩৪ জন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি পূরণে সরকার পর্যায়ক্রমে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নিয়োগ নয়, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সঠিক বণ্টনও নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ও অন্যান্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই রোগীদের নিজস্ব ব্যয় থেকে আসে। এতে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। ওষুধ ব্যয়ই সবচেয়ে বেশি, যা মোট চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ দখল করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ জানিয়েছেন, চিকিৎসা ব্যয়ের ভার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়ছে। অনেকেই চিকিৎসা নিতে না পেরে ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন, আবার অনেকে সঞ্চয় বা সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় মেটাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রীয়করণও একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উচ্চতর চিকিৎসা সেবা মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান জানিয়েছেন, সুপারিশ প্রদান করা কমিশনের দায়িত্ব ছিল, বাস্তবায়ন সরকারের ওপর নির্ভর করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি এবং বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন:








