দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ গুণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে; অথচ ২০২৫ সালের এই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন।
বিশেষজ্ঞরা সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো: টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে—২৪৫ জন, যা মোট রোগীর ৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন (২০ দশমিক ২৬ শতাংশ)। চট্টগ্রামে ৯৩ জন, ময়মনসিংহে ৮০ জন, বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন করে, সিলেটে ১৩ জন এবং রংপুরে ছয়জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে এ তথ্য কেবল সরকারি হাসপাতালের; বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে আক্রান্ত অনেক রোগীর তথ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই।
সমকাল প্রতিনিধিদের দেওয়া বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গসহ অন্যান্য জটিলতায় ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৫ জন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয়জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চারজন এবং রাজশাহী, পাবনা ও গোপালগঞ্জে একজন করে শিশু মারা গেছে। বরিশালে এক, বরগুনায় তিন, ভোলায় দুই ও ঝালকাঠিতে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জাতীয় টিকাদান কারিগরি পরামর্শক দল গতকাল হামের টিকা দেওয়ার বয়স ছয় মাসে নামানোর সুপারিশ করেছে। দলটির পর্যবেক্ষণ, সাম্প্রতিক সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৯ মাসের কম, যা বর্তমান টিকাদানের বয়সসীমার বাইরে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সচিবালয়ে জানান, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী দুই কোটি শিশুকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়া হবে। এই কর্মসূচি জুন বা জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত হবে। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ ও ১৫ মাস বয়সী শিশুদের দুই ডোজ টিকা দেওয়ার নিয়ম আগের মতো বহাল থাকবে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি সাধারণত প্রতি ছয় বছর পরপর নেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এটি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের পরিকল্পিত বিশেষ কর্মসূচি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। গত বছর গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান অন্তত তিনবার ব্যাহত হয়েছে। অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত থাকায় টিকাদান কার্যক্রমে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়। নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়ায় শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, যা হামের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশীদের বক্তব্য, প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকায় কয়েক বছর পরপর হামের প্রাদুর্ভাব চক্রাকারে ফিরে আসে। টিকাদান কর্মসূচি ও আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন), জানান, হাম নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। তার মতে, উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে ২০ শতাংশের নমুনায় হামের জীবাণু মিলছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন জানান, চলতি মাসে সোমবার পর্যন্ত ২৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। হাসপাতালটিতে উপসর্গসহ আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২৭০ জন। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ছয় থেকে নয় মাস বয়সীরা বেশি, যার ৬০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম হাসপাতালটি পরিদর্শন শেষে জানান, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার জটিলতা এবং গত দেড় বছরের আন্দোলনের কারণে টিকা কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। তিনি বলেন, চার মাসের শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাই নয় মাসের আগে সংক্রমণের কারণ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:








