শনিবার

২৮ মার্চ, ২০২৬ ১৪ চৈত্র, ১৪৩২

নীরব মহামারি এএমআর: বিশ্ব স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন সতর্কবার্তা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৮ মার্চ, ২০২৬ ১০:৩৬

শেয়ার

নীরব মহামারি এএমআর: বিশ্ব স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন সতর্কবার্তা
ছবি সংগৃহীত

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। একসময় যে সাধারণ সংক্রমণেও মানুষের মৃত্যু হতো, সেই পরিস্থিতি বদলে দেয় এই ওষুধ। তবে বর্তমানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন একটি নীরব মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল হলো এমন ওষুধ, যা সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে ধ্বংস করে বা তাদের বৃদ্ধি রোধ করে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক (ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে), অ্যান্টিভাইরাল (ভাইরাসের বিরুদ্ধে), অ্যান্টিফাঙ্গাল (ছত্রাকের বিরুদ্ধে) এবং অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক (পরজীবীর বিরুদ্ধে) ওষুধ।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ঘটে তখনই, যখন জীবাণু সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করে এবং প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে আগে কার্যকর ওষুধও আর কাজ করে না এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে মানবসৃষ্ট নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন না করা, পশুপালন ও কৃষিতে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য।

১৯২৮ সালে Alexander Fleming পেনিসিলিন আবিষ্কারের মাধ্যমে আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক যুগের সূচনা করেন। তবে তিনি তখনই সতর্ক করেছিলেন যে, ওষুধের অপব্যবহার জীবাণুকে প্রতিরোধক্ষম করে তুলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি তার সেই সতর্কবার্তারই বাস্তব প্রতিফলন।

World Health Organization-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিশ্বে প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ সরাসরি এএমআরের কারণে মারা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা বছরে এক কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অনেক ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে এমন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকও কার্যকর হচ্ছে না। পাশাপাশি পোলট্রি ও ডেইরি খাতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় ব্যক্তিগত ও নীতিনির্ধারণী—উভয় পর্যায়ে পদক্ষেপ জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করা, নির্ধারিত ডোজ সম্পূর্ণ করা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং টিকা গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অন্যদিকে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষি ও পশুপালনে ওষুধ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণ বা ছোট অস্ত্রোপচারও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই নীরব মহামারি প্রতিরোধের প্রধান উপায়।



আরও পড়ুন:

banner close
banner close