ঝিনাইদহের মহেশপুরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভৈরবা ২০ শয্যা হাসপাতাল উদ্বোধনের তিন বছর পার হলেও চালু হয়নি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। যেখানে থাকার কথা ছিল রোগীদের ভিড় আর চিকিৎসকদের ব্যস্ততা, সেখানে এখন নীরব ও প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে হাসপাতালটি। অযত্ন-বহেলায় ভবনের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়ছে, নষ্ট হচ্ছে রং। চুরি হয়ে গেছে পানির কল, বেসিনের ট্যাপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। এতে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আশপাশের ৭ থেকে ৮টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহেশপুর শহরের জলিলপুর পাঁচরাস্তা মোড় থেকে ভৈরবা সড়কের পাশে ভৈরবা সাঁকোর খাল এলাকায় নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন হাসপাতাল ভবন। তবে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনের রং ও পলেস্তারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। হাসপাতাল চত্বরে জন্মেছে আগাছা। অভ্যন্তরীণ সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে জমে রয়েছে ধুলাবালি ও ময়লা। দেয়াল ও কোণায় তৈরি হয়েছে মাকড়সার জাল।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ হাসপাতালের মূল উদ্দেশ্য ছিল জেলার সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু উদ্বোধনের তিন বছর পার হলেও প্রশাসনিক অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালগুলোতে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি রোগীদের নিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সামাউল ইসলাম বলেন, হাসপাতালটি চালু হলে যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা শহরে যেতে হবে না। জরুরি রোগী নিয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুজাহিদ ইসলাম বলেন, হাসপাতাল নির্মাণ হয়েছে তিন বছর আগে। মন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন, এরপর আর কেউ আসেনি। গেটে সব সময় তালা ঝুলে থাকে। সরকারি সম্পত্তি দেখার কেউ নেই। কবে চালু হবে, তা কেউ জানে না। সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে জেলা শহরে যেতে হয়। দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা দরকার।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাসপাতালের ভবনটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। এখানে কোনো পাহারাদারও নেই। সন্ধ্যার পর দেয়াল টপকে বখাটেরা ভেতরে আড্ডা দেয়। পানির কল, বেসিনের ট্যাপসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাসপাতালটিতে সেনাবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। এতে হাসপাতালের অবকাঠামো ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিছুটা সুরক্ষিত ছিল। তবে নির্বাচনের পরপরই সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতাল চালুর বিষয়ে এখনো প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তিনবার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আবারও চিঠি প্রস্তুত করা হচ্ছে। আইনমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল ভবনের কয়েকটি স্থানের রং নষ্ট হয়ে গেছে এবং ধুলাবালি ও ময়লা জমেছে। হাসপাতালটি চালু হলে আশপাশের ৭ থেকে ৮টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে। চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যাবে।
প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি উদ্বোধনের তিন বছর পেরিয়েও চালু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়ে হাসপাতালটি চালুর মাধ্যমে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবার সংকট দূর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আরও পড়ুন:







