শুক্রবার

৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২ কার্তিক, ১৪৩৩

টেকনাফে পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ১৬:৩২

শেয়ার

টেকনাফে পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর
ছবি সংগৃহীত

কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গুলিতে আহত সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে আজ শুক্রবার সকালে টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করেছে যৌথবাহিনী।

সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় স্থানীয়দের উদ্বেগ

পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মানবপাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ জুমার নামাজের পর টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন ছাত্র প্রতিনিধিরা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখ নিহত হন। অভিযানে মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশ অংশ নেয়।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি বলেন, গতকাল ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে তথ্য যাচাই-বাছাই করে জানা যায়, তাঁদের মধ্যে একজন দালাল ছিলেন।

আট দিন ধরে পাহাড়ের ঝুপড়িতে বন্দি

থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আট দিন ধরে মানবপাচারকারীরা পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে তাঁকে বন্দি করে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।

আসাদুজ্জামান বলেন, একটি ব্রিজে চাকরির সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাঁদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। তাঁর মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাঁকে পাহাড়ে নিয়ে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, পাহাড়ে গিয়ে তাঁর মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে থাকতে দেখেন। তখন বুঝতে পারেন, তিনি মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।

আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাঁকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ গতকাল তাঁদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই সেনাবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।

১ লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ

পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাঁদের মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই তাঁরা জানতে পারেন, দুজনকে ১ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।

তাঁরা বলেন, পাঁচ দিন ধরে সেখানে প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে জড়ো করতে দেখেছেন। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে ব্যাপক মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় তাঁরাও মারধরের শিকার হন। পরে তাঁদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

তাঁদের ভাষ্য, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা লাউ ও ডাল। ক্ষুধায় তাঁদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল। গতকাল তাঁদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।

পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি স্থানীয়দের

হ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন রশিদ বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। তা না হলে মানবপাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে সশস্ত্র অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। গতকাল পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায়। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও প্রশাসন খোঁজখবর রাখছে।

তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।



আরও পড়ুন: