ফসলের জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় অন্তত দুই গুন বেশি সার ব্যবহার করেন অনেক কৃষক। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অপচয় হচ্ছে মূল্যবান কৃষি উপকরণ, পাশাপাশি মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণের ওপরও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। অতিরিক্ত সার ব্যবহার বন্ধ,কৃষকের অধিকার নিশ্চিত এবং সার বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে এবার সার কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঝিনাইদহ কৃষি বিভাগ। এ কার্ডের মাধ্যমে জমির পরিমাণ ও ফসল অনুযায়ী সরকারি নির্ধারিত মাত্রায় সার পাবেন কৃষকেরা। পর্যায়ক্রমে জেলার সব কৃষককে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,সার কার্ডে কৃষকের ছবি, নাম,ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জমির পরিমাণের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি কোন কৃষক কোন ফসল চাষ করছেন, সেই তথ্যও রাখা হবে। কৃষি অধিদপ্তরের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি বিঘা জমিতে ধান,গম,পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল চাষে যে পরিমাণ ইউরিয়া,টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার প্রয়োজন, সেই হিসাবেই কৃষককে সার দেয়া হবে। প্রতিবার সার উত্তোলনের সময় কার্ডে সারের পরিমাণ,ফসলের নাম ও বিতরণের তারিখ লিখে রাখা হবে। ফলে একজন কৃষক নির্ধারিত মাত্রার বেশি সার নিতে পারবেন না। কার্ডধারী কৃষক সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তার প্রাপ্য সার পাবেন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা কমানো এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। অনেক কৃষক ধারণা থেকে প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি সার ব্যবহার করেন। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সার কার্ডের মাধ্যমে ফসলভিত্তিক সারের চাহিদা নির্ধারণ করা গেলে অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সারের সুষম প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। পাশাপাশি কোথাও কোথাও কৃষকদের মধ্যে সার কার্ড বিতরণও শুরু হয়েছে।
কৃষি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী,পর্যায়ক্রমে জেলার প্রত্যেক কৃষককে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এতে কৃষকের জমির পরিমাণ,আবাদি ফসল ও সারের প্রয়োজনীয়তার হিসাব এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে সার বিতরণে অনিয়ম, অতিরিক্ত উত্তোলন ও অপচয় রোধে নজরদারি সহজ হবে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে জমিতে বেশি সার প্রয়োগ করলেই ফলন বেশি হবে বলে মনে করেন। আবার প্রয়োজনের সময় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়তি ভোগান্তিতেও পড়তে হয়। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ফসলভিত্তিক নির্ধারিত মাত্রায় সার পাওয়া গেলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমবে,অন্যদিকে জমির উর্বরতা রক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।
শৈলকুপার কৃষক আব্দুল রহিম বলেন,'অনেক সময় আমরা ধারণা থেকে জমিতে বেশি সার ব্যবহার করি। মনে করি বেশি সার দিলে ফলন বেশি হবে। কিন্তু কৃষি বিভাগের নির্ধারিত মাত্রা অনুযায়ী সার ব্যবহার করলে খরচ কমবে এবং জমিরও উপকার হবে। সার কার্ডের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার ব্যবস্থা হলে আমরা উপকৃত হবো।'
কৃষক বসির আহমেদ বলেন,'ধান,পেঁয়াজ কিংবা গমের জমিতে সারের চাহিদা এক রকম নয়। কোন ফসলে কতটুকু সার প্রয়োজন,তা অনেক কৃষকই সঠিকভাবে জানেন না। কার্ডের মাধ্যমে জমি ও ফসল অনুযায়ী সার পাওয়া গেলে অতিরিক্ত সার কেনা ও ব্যবহারের প্রবণতা কমবে।'
কৃষক মফিজুর রহমান বলেন, আমরা চাই কার্ডধারী প্রত্যেক কৃষক যেন সময়মতো তার প্রাপ্য সার পান।'
শৈলকুপার ত্রিবেণী ইউনিয়নের সার ডিলার জাফর মোল্লা বলেন,'সার কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করা সহজ হবে। কৃষকের জমির পরিমাণ ও ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সারের হিসাব সংরক্ষণ করা যাবে। এতে সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে প্রকৃত কৃষকদের কাছে সঠিক পরিমাণে সার দিচ্ছি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষক ও ডিলার উভয়ের জন্যই সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল হবে।'
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন,'সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা,স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অতিরিক্ত সার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতেই সার কার্ড চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষি অধিদপ্তরের নির্ধারিত সুপারিশ অনুযায়ী জমির পরিমাণ ও ফসলভেদে কৃষকের সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হবে। কার্ডে প্রতিবার সার বিতরণের পরিমাণ,ফসলের নাম ও তারিখ উল্লেখ থাকবে। এতে কৃষকেরা তাদের প্রাপ্য সার পাবেন এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন। পর্যায়ক্রমে জেলার সব কৃষককে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে ফসলভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে এ উদ্যোগ।
আরও পড়ুন:







