পাহাড়ের সবুজ চূড়া ছুঁয়ে যেখানে সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়ায়, আর ভোরের আলোয় প্রকৃতির অপরূপ রূপ মন কেড়ে নেয়, মেঘের দেশ সাজেক যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় উপত্যকা। নাগরিক যান্ত্রিকতা ভুলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায় সেখানে মনের প্রশান্তি খুঁজতে। ক্যামেরার ক্লিক আর আনন্দধ্বনিতে মুখরিত থাকে যে পাহাড়ি পিচঢালা পথ, কদিন আগেও যার রূপ ছিল এমনই স্নিগ্ধ ও মোহনীয়।
কিন্তু, সেই স্বর্গীয় উপত্যকায় গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে হঠাৎ করেই নেমে আসে এক ঘনঘোর ও শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকার। ঘটনার সূত্রপাত সকালের সোনালী রোদ যখন সাজেক উপত্যকায় মাত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকগামী আঁকাবাঁকা সড়কে তখন শত শত চাঁদের গাড়ি আর পর্যটকবাহী যানের দীর্ঘ সারি।
ইউপিডিএফের অবরোধ ও গুলিবর্ষণ
নারী ও শিশুসহ অন্তত তিন হাজার পর্যটক ছুটির আমেজে এগিয়ে যাচ্ছিলেন প্রকৃতির টানে। কিন্তু পাহাড়ের বাঁকে যে তাদের জন্য ওত পেতে আছে এক পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তারা। সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় আকস্মিকভাবে ব্যারিকেড তৈরি করে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসীরা।
অত্যন্ত ধূর্ত কৌশলে আশপাশের নিরীহ পাহাড়ি গ্রামবাসীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে তারা তৈরি করে এক জীবন্ত মানবঢাল।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সাথে সাথেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল দল। কোনো রক্তপাত ছাড়াই অত্যন্ত সংযমের সাথে আলোচনার মাধ্যমে অচল অবস্থা নিরসন করতে চায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
কিন্তু শান্তির ভাষা কখনোই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিধানে ছিল না। উল্টো ইউপিডিএফ ক্যাডারদের প্ররোচনায় যৌথবাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
পরিস্থিতির অবনতি হলে যৌথবাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। ঠিক তখনই ঘটে সেই রুদ্ধশ্বাস বিস্ফোরণ, অতর্কিত গর্জে ওঠে ইউপিডিএফের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড বুলেট সরাসরি ছোড়া হয় পর্যটক ও সেনাসদস্যদের দিকে। গাড়ির ভেতরে মায়েরা সন্তানদের বুকে জড়িয়ে সিটের নিচে লুকিয়ে পড়ে।
কিন্তু, এই চরম উসকানির মুখেও নিজেদের অসামান্য পেশাদারিত্ব আর লৌহকঠিন সাহসিকতার পরিচয় দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পর্যটকদের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল কাউন্টারফায়ারে যায় সেনাজাওয়ানরা। সেনাবাহিনীর এই নির্ভুল পাল্টা গুলির মুখে টিকতে না পেরে লেজ গুটিয়ে পাহাড়ি অরণ্যে পালিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
এরপর সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে অবরুদ্ধ সেই ৩ হাজার পর্যটককে সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদে খাগড়াছড়ি সদরে পৌঁছে দেয়া হয়।
অবরোধের ডাক ও আধিপত্যের লড়াই
সাজেকজুড়ে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। তাদের ৫ দফা দাবি আদায়ের নামে চলা এই আন্দোলনের নেপথ্যে পাহাড়ে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারই হলো মূল লক্ষ্য। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
এদিকে গত দু'দিনে সাজেকের কলাবুনিয়া ও দূরদুরিছড়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্তু লারমার জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মধ্যে ৩ দফায় রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। দুই পক্ষের অন্তত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ফলে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে চরম আতঙ্ক।
অন্যদিকে, এই অবরোধের প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কে পাল্টা সর্বাত্মক অবরোধ ডাকায় সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে পর্যটক ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায়, সাজেকের প্রায় দেড়শ রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ মারাত্মক ধসের মুখে পড়ে।
ভূরাজনৈতিক ছায়াযুদ্ধের ইঙ্গিত
প্রাথমিকভাবে স্থানীয় চাঁদাবাজি ও ক্ষোভের হুমকি হিসেবে শুরু হলেও, পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য এবং এর পেছনের ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র ও পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা চক্রের গভীর চক্রান্ত এই ঘটনাকে এক বিশাল ভূরাজনৈতিক ছায়াযুদ্ধের রূপ দিয়েছে বলে মতামত রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে যা ঘটছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন উপজাতীয় ক্ষোভ নয়। এটি আগামী ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে সাজানো এক মাস্টারপ্ল্যান।
এছাড়া, বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে তথাকথিত শান্তি চুক্তির নামে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে যে অরক্ষিত ভূমিতে পরিণত করেছিল, সেই খালি ময়দানকেই এখন বেছে নেয়া হয়েছে অন্তর্ঘাতের প্রধান থিয়েটার হিসেবে।
সমালোচনা রয়েছে, তাদের মূল স্ট্র্যাটেজি অত্যন্ত পরিষ্কার, পাহাড়ে এই ভয়ংকর ও অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, নিরাপত্তা সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমস্ত মনোযোগ ও নজর সেদিকে আটকে রাখা। যাতে রাষ্ট্রযন্ত্র পুরো শক্তি নিয়ে পাহাড়ি বিদ্রোহ সামলাতেই ব্যস্ত থাকে। আর সেই সুযোগে দেশের মূল কেন্দ্রস্থলে বড় ধরনের অরাজকতা তৈরি করে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার জন্য দেশে ফেরার কিংবা ক্ষমতা দখলের পথকে মসৃণ ও সহজ করা যায়।
জানা গেছে, একদিকে ৩ হাজার পর্যটককে জিম্মি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি অনিরাপদ ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নজর ডাইভার্ট করে চক্রান্ত বাস্তবায়ন করাই ছিল এই চক্রান্তের মূল লক্ষ্য। কিন্তু সেনাসদস্যদের সাহসিকতা ও বিচক্ষণতায় সেই নীলনকশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
অস্ত্রের এই ঝনঝনানি ও ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চিরতরে বন্ধ করতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁকে সেনাবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে হবে বলে দাবি সচেতন মহলের। কোনো আন্তর্জাতিক চাপ, কোনো এনজিওর প্রেসক্রিপশন কিংবা কোনো মেকি মানবাধিকারের বুলির কাছে এই মাটির নিরাপত্তা জিম্মি থাকতে পারে না বলেই মত বিশ্লেষকদের।
আরও পড়ুন:







