মঙ্গলবার

৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯ কার্তিক, ১৪৩৩

শিক্ষার্থীর মৃত্যু; বাসের নিচে পড়ে ছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৭:৩১

শেয়ার

শিক্ষার্থীর মৃত্যু; বাসের নিচে পড়ে ছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা
ছবি সংগৃহীত

পড়ার টেবিলে সযত্নে রাখা বই-খাতা, কোণে পড়ে থাকা নীল রঙের স্কুল ব্যাগ আর আইডি কার্ড। পাশেই প্রিয় খেলার ক্রিকেট ব্যাট। আর ড্রয়ারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা আরএবি লেখা একটি প্লাস্টিকের খেলনা বাস।

এই খেলনা বাসটিই ছিল আট বছরের শিশু শাহরিয়ার শায়নের ভীষণ প্রিয়। যে বাসের চাকা ঘুরিয়ে ঘরজুড়ে সে আঁকত তার স্বপ্নের জগৎ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, সেই স্বপ্নের বাসের আদলেই বাস্তব স্কুলের বাসের চাকার নিচেই চিরতরে থেমে গেল তার জীবনপ্রদীপ।

ঘটনার বিবরণ

ঘটনা মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরের। ঘড়িতে তখন ঠিক দুপুর তিনটা বত্রিশ। ক্লাস শেষে সহপাঠীদের সাথে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শায়ন।

বাসে নিজের ব্যাগ রেখে বাইরে অন্য কাউকে খুঁজছিল শায়ন। ঠিক তখনই শিশুদের নিয়ে বের হওয়া একটি বাস হঠাৎ বাঁক নিলে বাসের পেছনের চাকার নিচে পিষ্ট হয় ছোট্ট শিশুটি। ঘটনাস্থলেই নির্জীব হয়ে পড়ে ওই কোমলমতি শিক্ষার্থী।

পরিবারের অভিযোগ

নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের জোরালো অভিযোগ, সম্পূর্ণ ঘটনাটি ঘটেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতিতে। বিদ্যালয়ের বাস ঘোরানোর সময় ড্রাইভারকে দিকনির্দেশনা দেয়ার মতো বা সতর্ক করার জন্য আশপাশে ছিল না কোন সহকারী বা হেলপার। যদি সঠিক সময়ে ন্যূনতম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকত, তবে হয়তো অকালে ঝরে যেত না এই তাজা প্রাণ।

তবে, মর্মান্তিক এই মৃত্যুর চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে পরবর্তী মর্মান্তিক লেন্সের চিত্র। হাতে আসা ছবিগুলো যাচাই করে দেখা যায়, কাগজের কার্টন জাতীয় কিছু দিয়ে বাসের নিচে পড়ে থাকা লাশ ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। স্কুলের ভেতর একটা শিশু দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পর কেন কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিল না? কেন তাঁর লাশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই বাসের নিচেই পড়ে থাকলো? তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে অনেকেই।

মরদেহ হস্তান্তর ও ময়নাতদন্ত

রূপগঞ্জে মর্মান্তিক ঘটনার পর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ছেলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রসঙ্গ তুললে তাতে জোরালোভাবে আপত্তি জানান শোকার্ত পিতা।

ঘটনার আকস্মিকতায় সম্পূর্ণ হতবাক ও দিশেহারা ওই বাবা কোনো ধরনের আইনি বা ফৌজদারি ঝামেলায় না জড়িয়ে থানা এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষকে ময়নাতদন্ত না করার মর্মে মুচলেকা দেন। পরবর্তীতে কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই অবুঝ সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি পাবনার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তারা।

স্থানীয় ও স্বজনদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি এবং দায়িত্বহীনতার কারণেই শায়নের এই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায় তারা।

স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ বিষয়ে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে পূর্বাচলের জলসিঁড়িতে অবস্থিত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল মুহম্মদ ফেরদৌস হাসান টিটু জানান, ঘটনাটির বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করা এবং শিশুদের সুরক্ষায় কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি এখন সর্বজনীন। কেবল তদন্ত কমিটি নয়, গাফিলতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার মাধ্যমেই থামানো সম্ভব এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি। অকালে ঝরে যাওয়া অবুঝ শায়নের মৃত্যুর বিচার নিশ্চিতে কতটুকু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।